১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবর সিডনির বন্দরে যখন ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ লাল ফিতা কেটে সিডনি অপেরা হাউসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন, তখন পুরো বিশ্ব অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছিল এক শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম বিস্ময়কে। তবে এই রাজকীয় চোখধাঁধানো উদ্বোধনের পেছনের ইতিহাস কিন্তু মোটেও কোনো মসৃণ রূপকথা ছিল না। চার দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা কেবল একটি স্থাপত্যের পর্দা উন্মোচন ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিক মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অসাধ্য সাধনের নাটকীয় গল্প।
নকশা প্রতিযোগিতা থেকে ডেনমার্কের অখ্যাত স্থপতির রাজকীয় বাজিমাত
গল্পের শুরুটা হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে, যখন অস্ট্রেলিয়া সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক উন্মুক্ত নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিশ্বের নামিদামি সব স্থপতিকে পেছনে ফেলে মাত্র তিসত্রিশ বছর বয়সী ডেনমার্কের অখ্যাত স্থপতি ইয়র্ন উটজন যখন এই অদ্ভুত পালের মতো দেখতে ভবনের নকশা জমা দেন, তখন অনেকেই সেটিকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মাত্র সাত মিলিয়ন ডলার খরচে চার বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও কাজ শুরু হতেই দেখা দেয় চরম কারিগরি জটিলতা। ওই যুগে এই ধরনের জটিল ও শূন্যে ঝুলে থাকা কংক্রিটের ছাদ তৈরি করা ছিল বিজ্ঞানের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, যার কারণে সময় এবং বাজেট দুটোই লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে।
রাজনৈতিক কোন্দল এবং মূল স্থপতির নিঃশব্দ প্রস্থান
কাজের ধীরগতি ও বাজেট তিন গুণ ছাড়িয়ে যাওয়ার অজুহাতে স্থানীয় সরকারের সাথে স্থপতি ইয়র্ন উটজনের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ ও অভিমানী উটজন ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে চলে যান এবং প্রতিজ্ঞা করেন তিনি আর কখনোই এ দেশে পা রাখবেন না। তার অনুপস্থিতিতে নতুন অস্ট্রেলীয় দল ভবনের ভেতরের নকশায় অনেক পরিবর্তন এনে কাজ শেষ করে। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে চলা রক্তঘাম করা কাজ আর প্রায় একশো দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর অবশেষে যখন ভবনটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলো, তখন দেখা গেল সিডনি অপেরা হাউস কেবল একটি সাংস্কৃতিক মিলনায়তন নয়, এটি বিশ্ব স্থাপত্যকলার এক নতুন পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজকীয় সেই উদ্বোধনী দিনের অবিশ্বাস্য হইচই
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হলো ১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবরের সোনালী সকালে। চার লাখেরও বেশি মানুষের জনসমুদ্র আর শত শত নৌকার ভিড়ে কেঁপে উঠেছিল সিডনি বন্দর। আকাশে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমানের ফ্লাইপাস্ট এবং বিশাল আতশবাজির ঝলকানিতে চারপাশ রঙিন হয়ে ওঠে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভবনটি শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন, তখন গোটা বিশ্ব একবাক্যে মেনে নিয়েছিল যে উটজনের সেই তথাকথিত অবাস্তব স্বপ্নই আজ পৃথিবীর অন্যতম সেরা মাইলফলক।
শতাব্দীর সেরা বিস্ময় হয়ে অমরতা লাভ
আজ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সিডনি অপেরা হাউসের আবেদন এতটুকু কমেনি, বরং প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ও শিল্পপ্রেমী এই অনন্য স্থাপত্য দেখার জন্য সিডনিতে ভিড় জমান। ২০০৭ সালে ইউনেস্কো যখন এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে, তখনো জীবিত ছিলেন এর মূল স্থপতি ইয়র্ন উটজন। নিজের তৈরি এই বিস্ময়কর সৃষ্টিকে নিজের চোখে আর কখনো সামনে থেকে না দেখলেও ইতিহাসের পাতায় তিনি ঠিকই অমর হয়ে রয়ে গেছেন। যে স্বপ্নকে একসময় সবাই পাগলামি ভেবে হেসেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই বিশ্বজয়ের গল্প লিখে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
