ব্রাজিলে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে প্রার্থীরা তাদের শক্তির শেষ প্রদর্শনী হিসেবে মাঠে নামায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) কোপাকাবানা সৈকত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সমর্থনে লাল সমুদ্রে পরিণত হয়। অন্যদিকে, ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর সমর্থনে গর্জে ওঠে শত শত বাইকারের দল।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী তিক্ত নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করার সাথে সাথে হাজার হাজার সমর্থক রাজপথে নেমে আসে, যা লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম এই দেশটিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি বিভক্ত ও মেরুকৃত করে তুলেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
আগামী সপ্তাহে ৮১ বছরে পা দিতে যাওয়া লুলা একটি প্রচারণামূলক ট্রাকের পেছনে লাফিয়ে ওঠেন এবং তাঁর দল 'ওয়ার্কার্স পার্টি' (পিটি)-র লাল পোশাক পরা বিশাল অনুসারীদের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ব্রাজিলের একটি বিশাল পতাকা নাড়ান। অত্যন্ত পরিচিত ভাঙা গলায় লুলা জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘জনগণকে দুটি পথের একটিকে বেছে নিতে হবে, হয় এমন কাউকে যিনি জাতীয় পতাকায় চুমু খান, অথবা এমন কাউকে যিনি মার্কিন পতাকায় চুমু দেন।’
রোববারের দ্বিতীয় ধাপের (রান-অফ) নির্বাচনটি নির্ধারণ করবে ব্রাজিল অঞ্চলটির গুটিসংখ্যক বামপন্থী দেশের একটি হয়ে থাকবে, নাকি ট্রাম্পের সহযোগী বলসোনারোর নেতৃত্বে ডানপন্থার দিকে যোগ দেবে।
গত ৪ অক্টোবরের প্রথম ধাপের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতাসীন লুলার ৪৫ শতাংশ ভোটের বিপরীতে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম ধাপে চমকপ্রদ ফলাফল অর্জন করেন।
কোপাকাবানার র্যালিতে যোগ দেওয়া ৩৯ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা প্যাট্রিসিয়া ভাসকনসেলোস দোস সান্তোস গুয়েদেস বলেন, ‘আমি দারুণ আত্মবিশ্বাসী। আমি স্বীকার করছি যে প্রথম ধাপের ফলাফল ছিল এক অপ্রীতিকর বিস্ময়, তবে রাজপথে মানুষের এই উপস্থিতিই সব ব্যবধান গড়ে দিচ্ছে।’
প্রথম ধাপের ফলাফলের পর রাজনৈতিক বামপন্থীরা নতুন করে জেগে ওঠে; তারা বিশাল বিক্ষোভের মাধ্যমে রাজপথ ভরিয়ে তোলে এবং লুলার ধারাবাহিক মেয়াদের জয় সুনিশ্চিত করার আশায় এক তীব্র ডিজিটাল প্রচারণা শুরু করে। হোটেল শিল্পে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী নিকোলাস দা সিলভা আলকানতারা আজেভেদো বলেন, ‘দিন দিন এটি এক চরম উদ্বেগের অবস্থা তৈরি করেছে। আমরা লড়াই করছি, ভোট নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি এবং গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি।’
'ডাটাফোলা' ইনস্টিটিউটের এই সপ্তাহের এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ভোটারদের পছন্দের ক্ষেত্রে উভয় প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট নিয়ে সমান অবস্থানে রয়েছেন।
বলসোনারোর পক্ষে বাইকারদের মিছিল
গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেট (যে রাজ্যের ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে) মিনাস জেরাইসের বেলো হরিজন্ত শহরটিতে বলসোনারোর জন্য অপেক্ষা করছিল বিশাল জনতার সমাবেশ, যার মধ্যে জাতীয় ফুটবল দলের হলুদ টি-শার্ট পরা শত শত বাইকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এবার্ট ডোরিগো নামের এক ব্যবসায়ী লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে মানুষকে রাষ্ট্রীয় কল্যাণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব মূল্যবোধ ধারণ করি তা হলো দেশ ও পরিবার। আমাদের দেশ আজ বিভক্ত, কারণ কল্যাণমুখী নীতির কারণে কিছু মানুষ বুঝতে পারেনি যে উন্নয়ন ও সাফল্য কেবল কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই আসে।’
ওয়ার্কার্স পার্টি ব্রাজিলে মোট যত বছর ক্ষমতায় ছিল তার দিকে ইঙ্গিত করে ৩৭ বছর বয়সী জোয়াও পাওলো বলেন, ‘অনেক হয়েছে, আর নয়। আমরা ১৬ বছর এই শাসন দেখেছি এবং এটা স্পষ্ট যে তা কাজে আসেনি। এখন পরিবর্তনের সময়।’
'কম ক্ষতিকর বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা'
গতকাল শুক্রবার রাতে প্রেসিডেন্সিয়াল চূড়ান্ত বিতর্কে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের প্রথম মুখোমুখি লড়াইয়ের চেয়ে কিছুটা শান্ত মেজাজ বজায় রাখেন, যা পূর্বে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও গালিগালাজে পরিণত হয়েছিল এবং কোনো নীতিগত প্রস্তাব ছিল না। লুলা সিনেটরের অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে আক্রমণ করেন, আর বলসোনারো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একটি ‘দেউলিয়া দেশ’ রেখে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। ব্রাজিলের প্রথম শ্রমজীবী শ্রেণির প্রেসিডেন্ট বলসোনারোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সে জানে না ক্ষুধা কী জিনিস।’ অন্যদিকে বলসোনারো বর্তমান প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করেন, ‘সবকিছুর দাম এত বেশি কেন?’
বলসোনারো নিজেকে তার উগ্র বাবা জাইর বলসোনারোর চেয়ে এক মধ্যপন্থি সংস্করণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২২ সালে লুলার কাছে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে তার বাবা বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তিনি ব্রাজিলের অপরাধ সমস্যা সমাধান, কারাগারে অতিরিক্ত ৫ লাখ কক্ষ তৈরি এবং সরকারি খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মূলত ভয়ভীতি প্রদর্শনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এই তীব্র তিক্ততামূলক প্রচারণা অনেক ভোটারকেই ক্ষোভের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ২৯ বছর বয়সী ইভেন্ট আয়োজক গ্যাব্রিয়েলা রিবেরো ভিয়ানা বলেন, ‘যদি অন্য কোনো প্রার্থী থাকত, তবে সেটি ভালো বিকল্প হতো। কিন্তু আমরা সবচেয়ে খারাপ, ভয়ানক এবং কম ক্ষতিকারের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছি।’
