‘আন্দাজী সাধন করো নারে মন, মূলে ভুলে ফল পাবি কিসে’ লালনের গানে, সাধুসঙ্গে মুখর ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি।ছবি: খবরের কাগজ
‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’–দেহরূপী খাঁচায় অধরা আত্মার রহস্য অনুসন্ধান, মনের মানুষের সন্ধান আর পরম সত্তার উপলব্ধির আকুলতা। একতারা-দোতারার সুরে, মরমি গানের আবেশে এবং সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তন অনুসন্ধানে আবারও এক হয়েছে সাধু-বাউল ও লালনভক্তরা।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় আজ শনিবার শুরু হচ্ছে লালন ফকিরের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব।
লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে ইতোমধ্যে জড়ো হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধক, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা। কারও কাছে এই আয়োজন গুরুর সান্নিধ্য লাভের, কারও কাছে আত্মশুদ্ধি ও সাধনার, আবার কারও কাছে মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে ফেরার এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্র। তাদের বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃত পরিচয় বাহ্যিক আচার, জাতপাত কিংবা ধর্মীয় বিভাজনে নয়; বরং মানুষের অন্তরের সত্য ও মানবিকতার মধ্যেই নিহিত।
আজ সকালে অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল সাধুসঙ্গ। বিকেলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরীর। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমি এ উৎসবের আয়োজন করেছে। তিন দিনের কর্মসূচিতে থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাধুসঙ্গ, মরমি সংগীত পরিবেশনা ও গ্রামীণ মেলা।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতেই দেহত্যাগ করেন বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই। তার রেখে যাওয়া গান ও দর্শন আজও মানুষকে আত্মপরিচয়, মানবতা এবং পরম সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে। ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কিংবা ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’–এমন অসংখ্য গানে তিনি মানুষের দেহ, মন, আত্মা, গুরু ও পরম সত্তার সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন গভীর দার্শনিক ব্যঞ্জনায়।
সাধু-বাউলদের কাছে তাই তিরোধান দিবসের এই আয়োজন নিছক কোনো স্মরণানুষ্ঠান নয়। এটি গুরুর বাণী স্মরণ, সাধনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধির একটি উপলক্ষ।
গানে গানে, ভাবের আদান-প্রদানে ও সাধুসঙ্গে তারা খুঁজে ফেরেন জীবনের গভীরতর অর্থ। বাহ্যিক জগতের কোলাহল পেরিয়ে নিজের ভেতরের মানুষকে চিনতে পারাই তাদের সাধনার অন্যতম লক্ষ্য।
জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানুষ
লালনের দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করা। প্রচলিত পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে উপলব্ধি করার আহ্বান তার গানে বারবার উঠে এসেছে। এই দর্শনে মানুষকে চেনার জন্য তার বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের পরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
লালন অনুসারীদের মতে, হানাহানি, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের এই সময়ে সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। তার বাণী যথাযথভাবে ধারণ ও চর্চা করা গেলে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার হতে পারে। মনের মানুষের সন্ধান আসলে নিজের ভেতরের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক সত্তাকে উপলব্ধি করারও এক সাধনা।
এ প্রসঙ্গে লালন গবেষক হৃদয় সাহা বলেন, ‘লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের রূপরেখা। বর্তমান সময়ে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে লালনের মানবতাবাদী দর্শন তরুণ প্রজন্মের মাঝে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার দর্শন নিয়ে গভীর গবেষণা ও চর্চা আরও বাড়াতে হবে।’
সাধুসঙ্গের পাশে গ্রামীণ মেলা
স্মরণোৎসব ঘিরে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে আখড়াবাড়ির পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। বসেছে গ্রামীণ মেলা। বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শনিবার সন্ধ্যা থেকে মঞ্চে পরিবেশিত হবে লালনসংগীত ও আলোচনা সভা। সাধুসঙ্গ ও মরমি গানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
নিরাপত্তায় প্রশাসনের প্রস্তুতি
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মাজার প্রাঙ্গণ ও মেলার স্থান পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম ও জেলা প্রশাসক।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘লালনের এই তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, এটি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি আয়োজন। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন।’
তিন দিনব্যাপী আয়োজন
ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ঢাকা, কুষ্টিয়াসহ দেশজুড়ে বিশেষ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
লালন সাঁইয়ের গান, দর্শন ও মানবতাবোধের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে আজ থেকে ১৯ অক্টোবর কুষ্টিয়ায় ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া আজ রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে থাকছে বিশেষ আয়োজন। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৬টায় আয়োজন করা হয়েছে ‘লালন স্মরণানুষ্ঠান’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। মুখ্য আলোচক থাকবেন শিল্পী ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী। সভাপতিত্ব করবেন যুগ্মসচিব ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন জনপ্রিয় লালনশিল্পীরা। আরও থাকবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) শিল্পীদের পরিবেশনা।
আজ শনিবার সারা দেশের অন্যান্য বিভাগ ও জেলাতেও বড় পরিসরে লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শনভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
