ক্রিকেটে ভাগ্য কখন কার জন্য কোন দরজা খুলে দেয়, তার দারুণ উদাহরণ হয়ে থাকল জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) তৃতীয় রাউন্ডের শেষ দিন। ম্যাচের শুরুতে একাদশেই ছিলেন না তিনি। স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিষেকের অপেক্ষাটাও হয়তো আরও দীর্ঘ হতে পারত। কিন্তু সতীর্থের মাথায় বলের আঘাত বদলে দিল সব হিসাব। কনকাশন বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই নিজের সামর্থ্যের জানান দিলেন ১৭ বছর বয়সী বাঁহাতি স্পিনার রাকিব হাওলাদার। অভিষেক ম্যাচেই পাঁচ উইকেট নিয়ে খুলনার জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠলেন তিনি।
সিলেটের একাডেমি মাঠে আজ চট্টগ্রামের বিপক্ষে খুলনার জয়টি এসেছে মাত্র ১০ রানে। তবে ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় রাকিবের অবিশ্বাস্য অভিষেক। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সময় মাথায় আঘাত পান সামিউর বশির। তার বদলি হিসেবে একই ধরনের খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হলে সুযোগ আসে রাকিবের সামনে। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে মাঠে নেমে সেই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করেন তিনি।
অথচ কয়েক মাস আগেও ঢাকার তৃতীয় বিভাগ লিগে খেলেছেন রাকিব। ইয়ুথ ক্রিকেট লিগ ও অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও স্বীকৃত ক্রিকেটে এটাই ছিল তার প্রথম ম্যাচ। অভিষেকেই এমন পারফরম্যান্স তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে। আগের দিন চার উইকেট নেওয়ার পর শেষ দিনে আহমেদ শরিফকে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন এই তরুণ। বাংলাদেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০২৪ সালে ঢাকা মহানগরের আশরাফুল ইসলামের পর অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বোলারও হলেন তিনি।
রাকিবের সঙ্গে খুলনার জয়ে বড় অবদান রেখেছেন শেখ মেহেদী হাসানও। ২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চট্টগ্রাম একসময় বিনা উইকেটে ১২৯ রান তুলে ফেলেছিল। সেখান থেকে হঠাৎই পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। রাকিবের স্পিনের পাশাপাশি মেহেদীর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে চট্টগ্রাম। অধিনায়ক ইরফান শুক্কুর ৩৭ বলে ৪৬ রান করে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ২৬৪ রানে থামে তাদের ইনিংস। তিন ম্যাচে এটি খুলনার দ্বিতীয় জয়। সাতবারের চ্যাম্পিয়নরা ১৯ পয়েন্ট নিয়ে উঠে এসেছে শীর্ষে!
রাকিবের অভিষেকের গল্পের পাশাপাশি তৃতীয় রাউন্ডের শেষ দিনে আলো ছড়িয়েছেন আরও দুই বাঁহাতি বোলার। তাদের একজন সিলেটের নাসুম আহমেদ, অন্যজন রাজশাহীর শফিকুল ইসলাম। দুজনই পাঁচ উইকেট নিয়ে নিজেদের দলের জয়ে রেখেছেন বড় ভূমিকা।
চট্টগ্রামে রংপুরের বিপক্ষে সিলেটের জয়টি ছিল রীতিমতো নাটকীয়। একপর্যায়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুরের হাতে। ২১০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দুই উইকেট হারিয়ে ১০২ রান তুলে ফেলেছিল তারা। তৃতীয় উইকেটে অনিক সরকার ও আবদুল্লাহ আল মামুনের ৫৭ রানের জুটিও রংপুরকে জয়ের পথেই রাখছিল। কিন্তু এরপরই ম্যাচে আবির্ভাব নাসুমের।
অনিককে ফিরিয়ে জুটি ভাঙার পর রংপুরের ব্যাটিংয়ে ধস নামান এই বাঁহাতি স্পিনার। অন্য প্রান্তে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন অফ স্পিনার নাঈম আহমেদ। দুজনের ঘূর্ণিতে মাত্র ৭০ রানের মধ্যে শেষ আট উইকেট হারায় রংপুর। ৫৫ রান করা অনিকের বিদায়ের পর আর কেউ বড় প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। ৬৯ রানে পাঁচ উইকেট নেন নাসুম। নাঈমের শিকার চার উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে আট উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরাও হয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৩৭ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সিলেট।
রাজশাহীতেও শেষ দিনে বল হাতে দাপট দেখিয়েছেন বাঁহাতি পেসার শফিকুল ইসলাম। বরিশালের বিপক্ষে আগের দিন শেষ বলে উইকেট নিয়ে যে অভিযান শুরু করেছিলেন, নতুন সকালে সেটিই পরিণত হয় পাঁচ উইকেটের সাফল্যে। দিনের শুরুতে বরিশালের হাতে ছিল পাঁচ উইকেট, লিড ছিল মাত্র ২১ রান। কিন্তু শফিকুলের বোলিংয়ে দ্রুত গুটিয়ে যায় তাদের দ্বিতীয় ইনিংস। মাত্র ২৫ রান যোগ করতেই শেষ পাঁচ উইকেট হারায় বরিশাল। শেষ চার উইকেট একাই তুলে নিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন শফিকুল।
জয়ের জন্য রাজশাহীর সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ৪৭ রান। ১০.৫ ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় স্বাগতিকরা। প্রথম দুই ম্যাচ ড্র করার পর এটি রাজশাহীর প্রথম জয়। অন্যদিকে টানা তিন ম্যাচ হেরে পয়েন্ট তালিকার তলানিতে বরিশাল।
এদিকে কক্সবাজারে ঢাকা ও ময়মনসিংহের ম্যাচে শেষ পর্যন্ত কোনো ফল আসেনি। চার দিনের খেলায় দুই দলের কেউই জয় তুলে নিতে পারেনি। শেষ দিনে ব্যক্তিগত সেঞ্চুরির খুব কাছে পৌঁছেও আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হয়েছে আরিফুল ইসলামকে। ৯২ রানে আউট হওয়ার পরই ড্র মেনে নেয় দুই দল। তিন ম্যাচ শেষে ঢাকা ও ময়মনসিংহের জয় যেমন নেই, তেমনি হারও নেই!
