গুগল তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা জেমিনিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার গুগল ক্লাউডের এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি সমন্বিত এআই সহকারীর ঘোষণা দিয়েছে, যা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেবে না, ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজও সম্পন্ন করতে পারবে। একটি মাত্র মাধ্যম থেকেই এসব কাজ পরিচালনা করা যাবে। এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখন এআইকে নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দেওয়া যাচ্ছে, আর সেটি নিজেই কাজের পরিকল্পনা তৈরি করে কোড লেখা, সভার সময় নির্ধারণ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা, ভ্রমণের ব্যবস্থা করাসহ নানা কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। একই সঙ্গে মেটার মিউজ, মেসেজিংভিত্তিক ইনস্টিংক্ট এবং সম্প্রতি চালু হওয়া চ্যাটজিপিটির ডটসের মতো এআই এজেন্টের উত্থানও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই অনুষ্ঠানের শুরুতে জানান, বর্তমানে জেমিনির মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ১০০ কোটির বেশি। ফরচুন ১০০ তালিকাভুক্ত প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানও এখন কর্মক্ষেত্রে জেমিনি এন্টারপ্রাইজ ব্যবহার করছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জেমিনির ব্যাপক ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে গুগল প্রথমে করপোরেট গ্রাহকদের জন্য নতুন এআই এজেন্ট চালু করবে। পরে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্যও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পিচাইয়ের মতে, প্রথমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এই প্রযুক্তি চালু করলে নিরাপত্তা, বৃহৎ পরিসরে পরিচালনা এবং কার্যক্ষমতার মতো জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে। গুগল ক্লাউডের প্রধান নির্বাহী থমাস কুরিয়ান ব্যাখ্যা করেন, নতুন এআই এজেন্টকে শুধু নির্দেশনা নয়, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্যও দেওয়া যাবে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারী কী অর্জন করতে চান, তা জানালে এআই নিজেই কাজের পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সরঞ্জাম ব্যবহার করবে এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করবে। সাধারণভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য জেমিনি নিজেই সবচেয়ে উপযুক্ত এআই মডেল নির্বাচন করবে। তবে ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজে মডেল বেছে নিতে পারবেন। শুরুতে অ্যানথ্রপিকের ক্লড মডেলও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ভবিষ্যতে উন্মুক্ত উৎসের মডেল এবং অন্যান্য নিজস্ব মডেল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে গুগলের। কাজের নির্দেশনার সঙ্গে ব্যবহারকারীরা ফাইল, ফোল্ডার কিংবা নির্দিষ্ট প্রকল্পের নথিও যুক্ত করতে পারবেন। এআই এজেন্টটি গুগল ওয়ার্কস্পেস, মাইক্রোসফট ৩৬৫, স্ল্যাক, জিরা, কনফ্লুয়েন্স, গিট, বিগকুয়েরি, ডেটাব্রিকস, পোস্টগ্রেস ও স্নোফ্লেকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক তথ্যভান্ডার ও ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কিংবা বাইরে থাকা মডেল কনটেক্সট প্রোটোকলভিত্তিক সার্ভারের সঙ্গেও নিরাপদে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে এটি। এর ফলে বিভিন্ন সফটওয়্যার ও তথ্যব্যবস্থা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে কাজ সম্পন্ন করা সহজ হবে। জেমিনি কী করছে, তা ব্যবহারকারীরা একটি বিশেষ কাজের তালিকা থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। সেখানে এআইয়ের কাজের প্রক্রিয়া, অন্য সহকারী এআইয়ের কাছে দায়িত্ব বণ্টন, বিশেষ দক্ষতা ব্যবহারের তথ্য, কোড এবং কাজের অগ্রগতি দেখা যাবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন এআই এজেন্টের জন্য আলাদা গুগল ওয়ার্কস্পেস অ্যাকাউন্ট থাকবেÑ অনেকটা প্রতিষ্ঠানের আরেকজন কর্মীর মতো। এর নিজস্ব ই-মেইল ঠিকানা এবং কাজের প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকবে। প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মী কোন দলে কাজ করেন, তাদের সময় অঞ্চল কী, কোন কাজের জন্য কার অনুমোদন প্রয়োজন এবং কার ক্যালেন্ডারে কী নির্ধারিত আছেÑ এ ধরনের তথ্য ব্যবহার করে এজেন্টটি কাজ করতে পারবে। ব্যবহারকারীরা এজেন্টকে কোনো কাজে যুক্ত করতে পারবেন তাকে উল্লেখ করে, ই-মেইল পাঠিয়ে, ফাইল বা তথ্য ভাগ করে কিংবা দলীয় কথোপকথনে যুক্ত করার মাধ্যমে। এজেন্ট কোনো পদক্ষেপ নিলে তার রেকর্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবর্তে এজেন্টের নামেই সংরক্ষিত হবে। এতে পরবর্তী সময়ে কাজের ইতিহাস যাচাই করা সহজ হবে। নতুন এআই এজেন্টটি আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েডচালিত মোবাইল ফোন, উইন্ডোজ ও ম্যাক কম্পিউটার, কমান্ড-লাইন ব্যবস্থা, গুগল ওয়ার্কস্পেস, মাইক্রোসফট ৩৬৫, সার্ভিসনাউ এবং স্ল্যাকের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে। প্রাথমিক পরীক্ষামূলক ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া পোশাকের ব্র্যান্ড অন, অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান শপিফাই এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা পেপ্যাল। এ ছাড়া জেমিনি এন্টারপ্রাইজের গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বিএনপি পারিবাস, ব্রাদেস্কো, মার্ক, অরেঞ্জ স্পেন, স্যান্টি কুপার, সোমপো, আলটা বিউটি ও ওয়েসফার্মার্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠান। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুগল নতুন কিছু ব্যয় ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক এআই মডেলের সমন্বিত ব্যবহার, কাজ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপযুক্ত মডেল নির্বাচন এবং ব্যয়ের তাৎক্ষণিক সীমা নির্ধারণের সুবিধা। গুগলের এই উদ্যোগ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এত দিন এআই মূলত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, লেখা তৈরি কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন এজেন্টভিত্তিক ব্যবস্থায় এআইকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য দিয়ে একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে এর সংযোগ, অনুমতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাজের ফলাফল যাচাইয়ের ওপর।
