কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুরে বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। দুই উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে নতুন নিয়োগ পাওয়া নয়জনই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী কিংবা তাদের স্বজন। কারও পরিচয় কেন্দ্রীয় নেতা, কারও জেলা ও উপজেলা নেতার স্ত্রী বা আত্মীয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিজ ইউনিয়নের বাইরে নিয়োগ, নির্ধারিত সার সংরক্ষণাগার না থাকা এবং গুদাম হিসেবে আবাসিক হোটেল দেখানোর অভিযোগ। কৃষকের স্বার্থে প্রণীত নীতিমালা উপেক্ষা করে এমন নিয়োগের ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রৌমারী ও চর রাজিবপুরের নয়টি ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নেত্রী, জেলা বিএনপির নেতার স্ত্রী, উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির পদধারী নেতা এবং যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী। নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি কয়েকজনের ক্ষেত্রে ঠিকানা ও গুদামসংক্রান্ত শর্ত পূরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রৌমারী উপজেলা সদর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মমতাজ হোসেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক। নথিপত্রে তার ঠিকানা দক্ষিণ টাপুরচর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দক্ষিণ টাপুরচর রৌমারীর সদর ইউনিয়নের নয়, বন্দবেড় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। ফলে নিজ ইউনিয়নে বসবাসের শর্ত অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বন্দবেড় ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীর হোসেন। তিনি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাশেমের ভাগ্নে। অভিযোগ রয়েছে, আলমগীর হোসেনের নিজস্ব কোনো সার সংরক্ষণাগার নেই। ‘নৌবন্দর আবাসিক হোটেল’ নামের একটি ভবনকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার সংরক্ষণ ও বিতরণের উপযোগী গুদাম হিসেবে ভবনটি কতটা উপযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
যাদুরচর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে মেসার্স জমজম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাসনা হেনা কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনে দলটির মনোনয়নপ্রাপ্ত আজিজুর রহমানের স্ত্রী।
রৌমারীর অন্য ইউনিয়নগুলোতেও নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা চলছে। দাঁতভাঙা ইউনিয়নে মেসার্স স্বাধীন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. স্বাধীন হোসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। শৌলমারী ইউনিয়নে মেসার্স নাইম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হুদা ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব। চরশৌলমারী ইউনিয়নে মেসার্স সম্রাট অ্যালুমিনিয়াম স্টোরের স্বত্বাধিকারী আহমেদ নুরে আলম ফেরদৌস ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
অন্যদিকে রাজিবপুর ইউনিয়নে মেসার্স রিতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোছা. রেজিনা তাসরিন ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি জেলা বিএনপির সদস্য ও রাজিবপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোখলেছুর রহমানের স্ত্রী। কোদালকাটি ইউনিয়নে মেসার্স সোহান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহানুর রহমান ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শাহাজালাল তারেকও ছাত্রদলের নেতা।
এভাবে দুই উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে নতুন নিয়োগ পাওয়া নয়জনের প্রত্যেকের সঙ্গে বিএনপির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগে অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার শর্ত, আবেদনকারীদের মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া যাচাই করেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সার ডিলারশিপের জন্য রৌমারীতে ১৪৫ জন এবং রাজিবপুরে ৫৫ জন আবেদন করেছিলেন। দুই উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বিপরীতে শেষ পর্যন্ত নয়জনকে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সরকারি সার বিতরণ নীতিমালায় ডিলারের নির্ধারিত স্থানে সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকা এবং নিজ ইউনিয়নে বসবাসের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় অন্তত কয়েকজনের ঠিকানা ও গুদামসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় যাচাই-বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে আবেদনকারীদের মধ্যে থেকে কীভাবে নয়জনকে নির্বাচন করা হলো, তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ে কোন কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং অভিযোগ ওঠা ঠিকানা ও গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক মমতাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিএনপি নেতাদেরই ডিলারশিপ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিএনপি নেতারা না পেলে ডিলারশিপ আর কারা পাবে?
জেলা বিএনপির সদস্য আজিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সবাইকে না দিয়ে দুয়েকজনকে দলের বাইরে দেওয়া হলে ভালো হতো। তবে আমার স্ত্রীর ক্ষেত্রে সরকারি সব শর্ত মেনেই নিয়োগ হয়েছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ মো. রওশন কবির দলীয়করণের বিষয়টি অস্বীকার করে কালবেলাকে বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে জেলা পর্যায় থেকে সেই তালিকাই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখানে দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই।’
