বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার প্রচলিত ধারণাকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। একসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেবল বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি কিংবা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার বিষয় বলে মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে মানবজীবনের নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বিস্তৃত হচ্ছে। শিক্ষা খাতও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির প্রসার শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিখন, মূল্যায়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্রবেশ কি শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন কোনো সংকট সৃষ্টি করবে? বাস্তবতা হলো, এআইয়ের মাধ্যমে যেমন শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি এর অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত ব্যবহার শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং প্রকৃত শিখন অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অতএব, এআইকে শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে না দেখে শিক্ষার লক্ষ্য, পদ্ধতি ও শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এআইয়ের সাহায্যে একই বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীর সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। কোনো শিক্ষার্থী জটিল বিষয় বুঝতে অসুবিধা অনুভব করলে এআইয়ের মাধ্যমে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা ও উদাহরণের মাধ্যমে সমাধান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার তুলনামূলকভাবে অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি করা যেতে পারে উচ্চতর চিন্তাশক্তিনির্ভর প্রশ্ন, সমস্যা সমাধানের অনুশীলন এবং অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম। এভাবে এআই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিখনকে আরও কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে এআই শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাক পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। প্রচলিত শ্রেণিব্যবস্থায় কোনো নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার পর শিক্ষকের মূল্যায়ন পেতে শিক্ষার্থীকে অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু উপযুক্ত এআই টুল ব্যবহার করে শিক্ষার্থী তার উত্তরের দুর্বলতা, ভাষাগত ভুল কিংবা কোনো সমস্যার সমাধানে কোথায় ভুল হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারে দ্রুত। ফলে সে নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ পায় এবং শিখনপ্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। তবে এআইয়ের দেওয়া সমাধান সব সময় সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকের মাধ্যমে তা যাচাই করা অপরিহার্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন সামনে আসছে। সেটি হলো, ভবিষ্যতে কি এআই শিক্ষকের স্থান দখল করবে? প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এআই ইতোমধ্যে পাঠ্য বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা দেওয়া, প্রশ্নের উত্তর তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদানের সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, ভবিষ্যতে শিক্ষক ছাড়াই শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সাহায্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। কিন্তু শিক্ষা কেবল তথ্য প্রদান কিংবা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু আয়ত্ত করার প্রক্রিয়া নয়। কারণ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক দায়িত্বশীলতা গঠন, আবেগীয় বিকাশ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়। একজন দক্ষ শিক্ষক শুধু বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহকে জাগিয়ে তোলেন, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ান, ভুল থেকে শেখার পরিবেশ সৃষ্টি করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা দেন। শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থী কেন পিছিয়ে পড়ছে, কেন তার মধ্যে শেখার আগ্রহ কমে যাচ্ছে কিংবা কী ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি তার শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে, এসব বিষয় বোঝার জন্য শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারবোধ থাকা প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার্থীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতুলনীয়। এ কারণে এআইকে শিক্ষকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে হলে আমাদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও সক্ষমতা এক রকম নয়। কোথাও ডিজিটাল সুবিধা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব রয়েছে। একইভাবে শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং অভিভাবকদের সচেতনতার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। এ অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন আনার পরিবর্তে পরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত এআই প্রযুক্তি চালু করার পরিকল্পনার চেয়ে কোন স্তরের শিক্ষায়, কোন উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের সহায়তার মাধ্যমে এআই ব্যবহার করা সম্ভব, তা নির্ধারণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একজন শিক্ষক যদি এআইয়ের ব্যবহার, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের যথাযথ নির্দেশনা দিতে পারবেন না। শুধু কোনো এআই টুল চালানোর নিয়ম শেখানোই যথেষ্ট নয়; বরং কোন কোন শিখন উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য এটি ব্যবহার করা উচিত, কীভাবে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করতে হবে এবং এর ব্যবহার কীভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, তা শেখানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রচলিত ব্যবস্থায় বাড়িতে তৈরি করা প্রতিবেদন কিংবা অ্যাসাইনমেন্টের ওপর অনেক সময় উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এসব কাজের কতটুকু শিক্ষার্থী নিজে করেছে এবং কতটুকু এআইয়ের সহায়তায় তৈরি হয়েছে, তা সব ক্ষেত্রে সহজে বোঝা যায় না। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখন অর্জন যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক উপস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষে উন্মুক্ত আলোচনা, ব্যবহারিক কাজ, প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণনির্ভর কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর শিক্ষার্থীকে এর ওপর যুক্তি, তথ্যের উৎস এবং সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে বলা যেতে পারে। এতে শুধু প্রস্তুতকৃত উত্তর তৈরি করার পরিবর্তে বিষয়টি সত্যিকার অর্থে বোঝার প্রয়োজন বৃদ্ধি পাবে। প্রসঙ্গত, কোনো লেখা বা অ্যাসাইনমেন্ট এআইয়ের সহায়তায় তৈরি কিনা তা জানতে শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা সমীচীন নয়। কারণ এ ধরনের সফটওয়্যার সব ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে বলতে পারে না কোনো লেখা এআই দিয়ে তৈরি হয়েছে কি না। এআই শুধু সম্ভাবনার কথা বলে দিতে পারে। কিন্তু শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারে না কোনো লেখা বা প্রতিবেদন এআই দিয়ে তৈরি কিনা। তাই কেবল যান্ত্রিক শনাক্তকরণের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অসততার অভিযোগ না এনে কাজের প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীর ব্যাখ্যা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। মূল্যায়নের উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীকে নম্বর দেওয়া নয়; বরং সে কী শিখেছে, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং কীভাবে আরও ভালো করতে পারে, তা নির্ধারণ করা। এআইয়ের যুগে এই মৌলিক উদ্দেশ্যকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, এটা ঠিক। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, ভুল তথ্য ও গোপনীয়তার ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের দায়িত্ব প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব মানুষকেই পালন করতে হবে। সুতরাং, শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারছে, অন্যদিকে এটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা দিচ্ছে। এআইকে শিক্ষার সংকটে পরিণত করা হবে, নাকি গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ারে রূপ দেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রস্তুতি ও ব্যবহারের নীতির ওপর। তাই এআইকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে প্রকৃত শিক্ষাগত অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সাবেক অধ্যক্ষ।
The post শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিক্ষার নতুন দিগন্ত নাকি চ্যালেঞ্জ? appeared first on Dhaka Protidin.
