যে কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যে গিটারের সুরে মুখর হয়ে উঠত কনসার্টের মঞ্চ, সেই কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে হারানোর আট বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল। শারীরিকভাবে তিনি না থাকলেও গান, সুর আর গিটারের জাদুতে আজও অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে বেঁচে আছেন তিনি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ আইয়ুব বাচ্চু। সময়ের ব্যবধানে আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার সৃষ্টি ও সংগীতের আবেদন এতটুকু কমেনি।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এই শিল্পী। বরাবরের মতোই মৃত্যুবার্ষিকীতে আইয়ুব বাচ্চুকে ঘিরে ছিলো নানা আয়োজন। পারিবারিকভাবে তাকে স্মরণ করে দোয়া মাহফিল করা হয়। এছাড়া ব্যান্ড সমাজ থেকেও তাকে স্মরণ করা হয়।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। পরিবারের অমত থাকলেও ব্যান্ডের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায় একেবারে শৈশবেই। ছেলের এমন আগ্রহ দেখে ১১তম জন্মদিনে বাবা একটি গিটার কিনে দেন। কিন্তু তখন কি আর কেউ কল্পনা করেছে, এই এগারোর কিশোর একদিন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় গিটারিস্ট ও ব্যান্ড তারকা হয়ে উঠবেন!
কলেজ জীবনে ওঠার পরই বন্ধুদের নিয়ে একটি ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রথমে এর নাম ছিল ‘গোল্ডেন বয়েজ’। পরে অবশ্য নাম বদলে ‘আগলি বয়েজ’ রাখেন। এই ব্যান্ডের গায়ক ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ। আর গিটারিস্ট ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তারা স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতেন।
১৯৭৭ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন এবি। সেখানে তিনি জেমসের সঙ্গে বাজিয়েছিলেন। তবে আইয়ুব বাচ্চুর উত্থানের সূচনা মূলত ১৯৮০ সালে ‘সোলস’-এ যোগদানের পর। এই ব্যান্ডের হয়ে দশ বছর পারফর্ম করেছিলেন তিনি। অতঃপর ভাবলেন, নিজে কিছু করা যাক। সেই ভাবনা থেকে ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। যা পরবর্তীতে ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ বা ‘এলআরবি’ নামে বিপুল খ্যাতি লাভ করে।
ব্যান্ডের হয়ে আইয়ুব বাচ্চু উপহার দিয়েছেন এলআরবি, সুখ, তবুও, ঘুমন্ত শহরে, ফেরারি মন, স্বপ্ন, আমাদের বিস্ময়, মন চাইলে মন পাবে, অচেনা জীবন, মনে আছে নাকি নেই, স্পর্শ এবং যুদ্ধ অ্যালবামগুলো।
এছাড়া একক শিল্পী হিসেবে তার অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে- রক্তগোলা, ময়না, কষ্ট, সময়, একা, প্রেম তুমি কি!, দুটি মন, কাফেলা, প্রেম প্রেমের মতো, পথের গান, ভাটির টানে মাটির গানে, জীবন, সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল, রিমঝিম বৃষ্টি, বলিনি কখনো, জীবনের গল্প। এর বাইরে তার গাওয়া গানের অসংখ্য মিক্সড অ্যালবাম রয়েছে।
আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে রয়েছে- ‘সেই তুমি’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘মেয়ে’, ‘কেউ সুখী নয়’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘রুপালি গিটার’, ‘উড়াল দেবো আকাশে’, ‘একচালা টিনের ঘর’, ‘তারাভরা রাতে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘বেলা শেষে ফিরে এসে’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’, ‘আম্মাজান’, ‘ফেরারি মন’ ইত্যাদি।
অডিও গানের পাশাপাশি বেশ কিছু চলচ্চিত্রের গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তারমধ্যে দারুণ জনপ্রিয় ‘আম্মাজান’ ছবির ‘আম্মাজান’ শিরোনাম গানটি। এছাড়াও ‘এক ঝাক পাখি উড়ে আকাশে’, ‘অনন্ত প্রেম’ ইত্যাদি গানগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো।
সংসারজীবনে তিনি স্ত্রী, ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব নামে এক কন্যা ও আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব নামে এক পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। নন্দিত এই শিল্পীর শ্রদ্ধায় তার জন্মশহর চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে একটি গিটার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ‘রূপালি গিটার’ নামের সেই ভাস্কর্য মাথা উঁচিয়ে এই কিংবদন্তির অবদানের কথা জানান দেয় বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে।
