সিভিতে ‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে ডব্লিউএইচওর পদ পাওয়ার অভিযোগে পুতুলের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে ‘মিথ্যা তথ্য’ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বাংলাদেশ
জার্নাল ডেস্কবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে ‘মিথ্যা তথ্য’ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান রোববার (১৮ আক্টোবর) এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
দুদকের অভিযোগ, সায়মা ওয়াজেদ তার জীবনবৃত্তান্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ‘অনারারি স্পেশালিস্ট বা এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার তথ্য দিয়েছিলেন। তবে তদন্তে ওই পদে তার কাজ করার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
দুদক সচিব বলেন, আমরা তথ্য সংগ্রহ করেছি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। সেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে ওখানে তিনি এরকম কোনো পদে ছিলেন না বা এরকম কোনো দায়িত্ব উনি পালন করেননি।
ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় সুনাম ক্ষুণ্ন’ করার মাধ্যমে অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ এ মামলা করে দুদক।
দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয় সেখানে।
তদন্ত শেষে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা যুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
মামলাটি তদন্ত করেছেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের মানিলন্ডারিং-১ শাখার উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন হিসেবে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন নেন। এ সময় তিনি বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেওয়ার সম্মতি দিয়েছিলেন।
তিনি অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিরও চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। এসব দায়িত্বে থাকাকালে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন সায়মা ওয়াজেদ।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, ওই জীবনবৃত্তান্তে বিএসএমএমইউতে সম্মানসূচক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার ‘মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য’ দেন তিনি। বিশেষ করে অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা এবং এ-সংক্রান্ত পাঠ্যক্রম তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য তার যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছিল।
দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, মিথ্যা তথ্য সিভিতে উনি উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি সাবেক বিএসএমএমইউ-তে অনারারি এক্সপার্ট হিসেবে উনি কাজ করেছেন। এরকম তথ্য দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে উনি এই পদ লাভ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোনো নথি না খুলে এবং তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দিয়ে ‘চাপ প্রয়োগ’ করেন। পরে সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের মাধ্যমে তার জীবনবৃত্তান্ত ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
দুদকের দাবি, এসব তথ্য ব্যবহার করেই সায়মা ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, বিএসএমএমইউ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা। সায়মা ওই পদে ছিলেন কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন কোনো তথ্য প্রতিষ্ঠানটি দিতে পারেনি।
সম্মানসূচক পদ হলে সেখানে কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অফিসিয়াল ফাইলে তো থাকতে হবে।”
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও নথি পর্যালোচনার পর সায়মার বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের’ অভিযোগে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
ডব্লিউএইচওর পদ থেকে পদত্যাগ
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তার মেয়ে পুতুল ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাঁচ বছরের জন্য ওই দায়িত্ব নেন।
ওই বছর অগাস্টের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার মা শেখ হাসিনা। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেখ হাসিনার পাশাপাশি পুতুলকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়।
জালিয়াতির অভিযোগে তদন্তের মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। পরে ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
২০২৬ সালের ৩ জুলাই সায়মার আইনজীবীদের দেওয়া একটি চিঠির তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে ‘চীন সফরে আর্থিক জালিয়াতি’ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। তবে এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
এদিকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে এক মামলায় পুতুলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। এর আগে তাকে ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আদেশ দিয়েছিল ঢাকার আদালত।
সায়মার বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগপত্র অনুমোদনের পর তাকে এবং শেখ হাসিনার পরিবারের অন্য সদস্যদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ সম্পর্কেও দুদক সচিবের কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা।
জবাবে তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চয় জানেন যে শুধু দুদক কাজ করছে না, এর সাথে অন্যান্য সংস্থাও জড়িত রয়েছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আমরা একযোগে কাজ করছি তাদেরকে ফেরত আনার জন্য। যখন যেটি করা দরকার, যে সমস্ত তথ্য চাওয়া হচ্ছে, আমরা সেগুলো সরবরাহ করছি।
এ বিষয়ে কোনো দেশ থেকে সাড়া পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনও পাইনি, আমরা আশাবাদী আমরা হয়তো এটার ব্যাপারে অচিরেই কোনো সুফল বা ভালো কোনো সংবাদ পেতে যাচ্ছি, ইতিবাচক।
কোন কোন দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে, জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, দোহা, কাতারসহ জেনেভা ও সুইজারল্যান্ডে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয়ে পাওয়া তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
