শৈশব কেটেছে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। কখনো পালক পরিবারের কাছে, কখনো দাদি-নানির স্নেহে। মা মারা যান তাঁর ১২ বছর বয়সে। জীবনের এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি আইরিশ অভিনেতা ব্যারি কিওগান। আজ হলিউডের পরিচিত মুখ তিনি। ‘দ্য ব্যানশিজ অব ইনিশেরিন’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন অস্কার মনোনয়ন, জিতেছেন বাফটা পুরস্কার। আর ‘সল্টবার্ন’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। ১৮ অক্টোবর ৩৪ বছরে পা রাখলেন এই অভিনেতা।
শৈশবের কঠিন দিন
১৯৯২ সালের ১৮ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম ব্যারি কিওগানের। তাঁর শৈশব ছিল অস্থিরতায় ভরা। মায়ের মাদকাসক্তির কারণে ছোটবেলায় তাঁকে ও তাঁর ভাইকে পালক পরিচর্যায় থাকতে হয়। আইএমডির তথ্যে বলা হয়েছে, ৭ বছর ধরে ১৩টি ভিন্ন বাড়িতে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। পরে দাদি, খালা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে বড় হন তিনি। ছিল অর্থনৈতিক কষ্টও। ২০২২ সালে ব্রিটিশ সাময়িকী জি-কিউ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিওগান জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন না। মায়ের মৃত্যুর পরও জীবন সহজ হয়নি। কৈশোরে স্কুলে নিয়মিত যেতেন না, নানা ঝামেলায় জড়াতেন। ১৬ বছর বয়সে স্কুল থেকেও বহিষ্কৃত হন।

লুকিয়ে সিনেমা দেখতেন
জীবনের নানা বাস্তবতা নিয়েও সিনেমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয়। তাঁর সিনেমার প্রতি আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। বন্ধুদের সঙ্গে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন। মার্লন ব্র্যান্ডো, জেমস ডিন ও পল নিউম্যানের মতো অভিনেতাদের অভিনয় দেখতেন। পর্দার চরিত্রদের পর্যবেক্ষণ করেই অভিনয়ের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতেন। তখন আশপাশের অনেকের কাছেই অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নটি বাস্তবসম্মত মনে হয়নি।
যেভাবে শুরু অভিনয়
কিওগানের অভিনয়জীবনের শুরু ২০১১ সালে। ডাবলিনের অপরাধজগতের পটভূমিতে নির্মিত স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্র ‘বিটুইন দ্য ক্যানালস’ দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ফেয়ার সিটি’ ও ‘লাভ/হেট’-এ অভিনয় করেন। প্রথম দিকে বড় তারকার মতো সুযোগ পাননি। ছোট চরিত্রে অভিনয় করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ২০১৪ সাল থেকে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। ২০১৭ সাল তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বছর। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ডানকার্ক’ ছবিতে জর্জ চরিত্রে অভিনয় করেন। একই বছর ইওর্গোস লানথিমোসের ‘দ্য কিলিং অব আ সেক্রেড ডিয়ার’ ছবিতে মার্টিন চরিত্রে তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে। অস্বস্তিকর, রহস্যময় ও জটিল চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
অস্কার মনোনয়ন, বাফটা জয়
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ব্যানশিজ অব ইনিশেরিন’ তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। ছবিতে ডমিনিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০২৩ সালে সেরা পার্শ্ব–অভিনেতা বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পান। একই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বাফটা পুরস্কার জেতেন। গোল্ডেন গ্লোবেও মনোনয়ন পান তিনি।
এরপর ২০২৩ সালের ‘সল্টবার্ন’ ছবিতে অলিভার কুইক চরিত্রে অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসেন। ছবির অস্বস্তিকর ও সাহসী দৃশ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্যও গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কারে মনোনীত হন। এ ছাড়া মার্ভেল ছবির ‘ইন্টারনালস’-এ ড্রুইগ এবং ‘দ্য ব্যাটম্যান’-এ জোকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় চরিত্রগুলো তাঁর অভিনয়ের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।
জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা, অভিনয়ে তার ছাপ
কিওগানের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। ২০১৮ সালে দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অন্য চরিত্র হয়ে ওঠার মধ্যে একধরনের মানসিক মুক্তি আছে। অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের কিছু সমস্যাও যেন প্রকাশ করা যায়। ২০২৫ সালে হলিউড অথেনটিক-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় তাঁকে ও তাঁর ভাইকে একাধিক পালক পরিবারের কাছে থাকতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন একটি চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে, যেখানে পালক পরিচর্যাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা উঠে আসে। তাঁর অভিনয়ের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, চরিত্রকে শুধু ভালো বা মন্দ হিসেবে দেখান না; বরং চরিত্রের ভেতরের একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা ও দ্বন্দ্ব তুলে ধরেন। শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন।

সম্পদের পরিমাণ কত?
ব্যারি কিওগানের সুনির্দিষ্ট আয় বা সম্পদের হিসাব প্রকাশ্যে নেই। তবে সেলিব্রিটি নেট ওর্থ নামের একটি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক শতকোটির টাকার বেশি। তবে অর্থ তাঁকে ভাবায় না। ২০২২ সালে আইরিশ ইনডিপেনডেন্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিওগান বলেছিলেন, ‘অর্থ, খ্যাতি আমার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা নয়। আমার কাছে সাফল্য হলো সুখী থাকা এবং আমার আশপাশের মানুষদেরও সুখী রাখা।’
এই বক্তব্য তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। শৈশবে অনিশ্চয়তা, পরিবারের সংকট ও একাকিত্বের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা কিওগানের কাছে সাফল্য যে কেবল খ্যাতি বা পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর কথায় তা স্পষ্ট।
