মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। কলকাতার অ্যাপেলো ও মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ২৫ জন।
এই বীভৎস দুর্ঘটনার পর থমকে গেছে শহরের উৎসবের আমেজ, জারি করা হয়েছে ১৬৩ ধারা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা ‘সিট’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
দুর্ঘটনার পর থেকেই পুলিশি ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলা হয়েছে পুরো চোরবাগান চত্বর। স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে চরম অব্যবস্থার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, পুজোর উদ্বোধনের পর থেকে উপচে পড়া ভিড় হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বরং কয়েক মিটার অন্তর দড়ি ফেলে ভিড় আরও বাড়িয়ে তোলা হয়েছিল।
ঘটনার রাতে ডিউটিতে থাকা সরকারি পুলিশকর্মী, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী এবং ক্লাব স্বেচ্ছাসেবকদের দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে কলকাতা পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও বয়ান খতিয়ে দেখার পর কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে মোট সাত জনকে গ্রেপ্তার করেছে এসটিএফ। ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির সম্পাদক রাজ কুমার সেওদা ওরফে রাজা, সহ-সভাপতি শান্তনু দুবে, বাঁশের কাঠামো প্রস্তুতকারক, ভিআইপি পাস পরীক্ষক, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ক্লাবের সদস্য এবং দুই প্রাইভেট সিকিউরিটি ইনচার্জ।
চোরবাগান কাণ্ডে মৃতদের পরিবারপিছু এককালীন ২৫ লাখ রুপি এবং পরিবারের একজনকে রাজ্য সরকারের গ্রুপ ‘ডি’ পদে চাকরি দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, আহতদের এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং সব চিকিৎসা খরচ সরকার বহন করবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৪ জন জখমকে ইএম বাইপাস সংলগ্ন অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যান তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন আহতদের বেশিরভাগের অবস্থাই বর্তমানে স্থিতিশীল। তবে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা।
এই বিষাদের আবহেই শনিবার কলকাতায় আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রোববার সকালে তিনি অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়ে জখমদের সঙ্গে দেখা করেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মধ্যেও ঢাকের বোল ও লোকশিল্পীদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জমকালো অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনায় তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধী শিবির।
তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের প্রশ্ন, একদিকে যখন গোটা রাজ্য চোরবাগানের ঘটনায় শোকস্তব্ধ এবং মানুষ জীবন বাঁচাতে লড়ছে, তখন শাসকদল ও বিজেপি নেতারা কীভাবে উৎসবের মেজাজে থাকতে পারেন? সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও প্রোটোকল সামলাতেই পুলিশ বেশি ব্যস্ত ছিল বলে অভিযোগ তুলেছে তারা।
এছাড়া, চোরবাগান পুজো কমিটির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এক ‘ভাইপো’র ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে বলে দাবি করে সুর চড়িয়েছে তৃণমূল, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
