Published on
:
2 min read
দেবশঙ্কর হালদার
‘আমি তো চিরকাল উত্তর কলকাতার পাইকপাড়ার মানুষ। সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতাতেও বাসস্থান হয়েছে। তবে শৈশব ও বড় হয়ে ওঠা কিন্তু উত্তর কলকাতার পরিবেশেই। গলির মধ্যে গলি। সেই গলিরও শেষ প্রান্তে এক টুকরো মাঠ। খেলাও হয়, পুজোও হয়। দল বেঁধে আড্ডাও হয়।
অনেককে নিয়েই আমাদের পরিবার যথেষ্ট বড় ছিল। চার ভাই, এক বোন। মা ও বাবা। আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও ঘনিষ্ঠ বৃত্তের যাতায়াত লেগেই থাকতো আমাদের পরিবারে। মায়ের আতিথেয়তায় কোনও ত্রুটি ছিল না। বাবা ছিলেন ভীষণ অমায়িক। পুজোর ক’দিন খাওয়াদাওয়ার একটি তালিকাও মা বানিয়ে রাখতেন। মহালয়ার আগে থেকেই ঘর-দোর পরিষ্কার শুরু হয়ে যেত।
Ei samay
আর নতুন জামা-কাপড়? সেটা ছিল আরও বড় প্রস্তুতি। ঠিক সময়ে বাবার ডাক পড়তো। অর্থাৎ আমাদের চার ভাইকেই বড়বাজারে যেতে হবে বাবার সঙ্গে। খুব মজার ব্যাপার ছিল। চার ভাইয়ের জামার কাপড় কেনা হবে সেদিন। রং পছন্দ হলে বড় থান থেকে সেই কাপড় এনে সোজা দর্জির দোকানে গিয়ে মাপ দেওয়া। একই রঙের জামা চার ভাইকেই পরতে হতো। ওইদিন-ই জুতো কেনা হতো। পুজোর আগে বা পরে যাত্রাপালার খুবই চাহিদা ছিল। সেই সময়ে বাবা, অভয় হালদার অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। যখন তখন ডাক এলেই তাঁকে চলে যেতে হতো। তখন তো পুজো মানেই যাত্রার জয়জয়কার। বাবা সেই সময়ে আমাদের সঙ্গে না থাকলে সবারই মন খারাপ হতো। সেটাই স্বাভাবিক।
তবে খুব মন খারাপ হলে আমাদের কয়েকদিনের জন্য ঠিকানা হতো বহরমপুরের মামারবাড়ি। গ্রামের পুজো। কিন্তু কী সুন্দর সেই পরিবেশ, এখনও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কী ভাবে যে সময় ও দিনগুলি কেটে যেত তা একমাত্র ভগবানই জানেন। এখনও মনে পড়ে, মা যখনই জানিয়ে দিতেন এবার পুজোয় মামারবাড়ি যাওয়া হবে, সেদিন থেকেই মনের মধ্যে আনন্দের ঝড় বয়ে যেত। একদিকে মামারবাড়ির অসম্ভব প্রশ্রয়, যত্ন-আত্তি, দিলখুশ স্বাধীনতা— সব মিলিয়ে যেন সেই ‘সব পেয়েছির দেশে’ হারিয়ে যাওয়া। ওখান থেকে মামা চলে আসতেন আমাদের নিয়ে যেতে। সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যেত আমাদের আনন্দের দিন গোনা। এমনও হয়েছে আমরা ভাসানের দিন পড়ন্ত বিকেলে পৌঁছেছি। সে যেন বিশাল শোভাযাত্রা বেরোতো এবং তা পুরো গ্রাম জুড়েই। যা ছবির মতো মনে হয় এখনও।
তবে একটু বয়স বাড়তেই বন্ধুর সংখ্যাও বাড়ল। পাইকপাড়ার পুজোয় সময় কাটালেও কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম। তার আগে থিয়েটার দেখে নিতাম। পুজো মানেই তো থিয়েটারও দেখা। না হলে তখন মনে হতো আনন্দের মাঝেও কী যেন অপূর্ণ রয়ে গেল। এরপর পুজো এলে কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ মনের মধ্যে কাজ করতো। তখন স্কটিশ কলেজে পড়ি। সামান্য হলেও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু একটা বড় ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতো। পুজোয় সবাই নতুন জামাকাপড় পায় না। তবে আমরা কেন পরব? সেই থেকেই পুজো এলে আমরা দলবদ্ধ ভাবে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যেতাম যতটা সম্ভব দুঃস্থদের সাহায্য করতে। সেই অভ্যাস আজও আছে। মহালয়ার ভোরে বারুইপুরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিলাম। অন্তত কিছু মানুষের মুখে তো হাসি ফুটুক।
তবে হ্যাঁ, বছরভর অভিনয়, কর্মব্যস্ততা, ছোটাছুটি সব কিছুর পরেও ওই একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকি। তা হলে বলেই ফেলি, তা প্রায় ২০ বছর ধরে সোদপুরের এক পরিচিতর বাড়িতে অষ্টমী বা নবমীতে পরিবার-সহ যথারীতি পৌঁছে যাওয়া। দিনভর আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া। মন হয়ে যায় ফুরফুরে। সঙ্গে পরের বছরের প্রস্তুতি।’
অনুলিখন: বিপ্লবকুমার ঘোষ