
জালালাবাদ ডেস্ক : বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত আট মাসে ১৪ জেলার ১৯টি সরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৮৭৯টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৮৮টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিজ জেলা বা নির্বাচনী এলাকার ১৪টি হাসপাতালে। অর্থাৎ, নতুন শয্যার ৯৩ শতাংশই গেছে এসব হাসপাতালে। অথচ দেশের অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ আরও বেশি হলেও শয্যা বাড়ানো হয়নি।
অন্যদিকে, মন্ত্রীদের নিজ জেলা বা নির্বাচনী এলাকার বাইরে পাঁচটি হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯১টির। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, গত ২৮ এপ্রিল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া, বিএনপি সরকার দুটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি ১৫ মে ঠাকুরগাঁওয়ে। তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা এটি। অন্যটি ১৪ জুন নরসিংদীতে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নিজ জেলা।
১৯টি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শয্যা বাড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিজ জেলা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত ৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০০ করা হয়।
শয্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল দুটির প্রতিটির শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার করা হয়। মুগদা হাসপাতালটি ঢাকা-৯ আসনে, যা সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের নির্বাচনী এলাকা। আর দিনাজপুর সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নিজ জেলা।
গত ২১ মে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১৯ আগস্ট দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ করে বাড়ানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল দুটিতে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল যথাক্রমে ১৫৭ এবং ১৬৯ শতাংশ।
২০২৪ সালে দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মধ্যে এই হাসপাতালে শয্যাপ্রতি রোগীর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ ২০১৩ সালের পর থেকে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়নি। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ২০২৪ সালে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ৩২৯ শতাংশ। বগুড়া মেডিকেলে এ হার ছিল ৩০৮ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ৫২৪ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বগুড়ায় এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৬৪, অর্থাৎ ময়মনসিংহের তুলনায় অর্ধেকের কম।
অন্যদিকে, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর ও বরিশালের হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়নি। অথচ এসব হাসপাতালে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল যথাক্রমে ২৬৬, ২৫৯, ২২১, ১৯৯ ও ১৯০ শতাংশ। শয্যাসংকটে থাকা হাসপাতালগুলোর মধ্যে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত ৮ অক্টোবর ৯০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ছিলেন ৩ হাজার ১৭২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যাসংখ্যার তিন গুণের বেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এছাড়া সেপ্টেম্বরে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ করা হয়। অন্যদিকে, মন্ত্রীদের এলাকার বাইরের পাঁচটি হাসপাতালে নতুন করে মাত্র ১৯১টি শয্যা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রংপুরের তারাগঞ্জ, সিলেটের ওসমানীনগর, পাবনার আটঘরিয়া ও ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিটিতে ১৯টি করে শয্যা বাড়ানো হয়। এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আগে ৩১টি করে শয্যা ছিল। বাকি ১১৫টি শয্যা ঢাকার জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউটে অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির শয্যাসংখ্যা ২৫০-এ উন্নীত হয়েছে।
সাবেক স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, কোন হাসপাতালের শয্যা আগে বাড়ানো দরকার, তা নির্ধারণ করতে হবে শয্যার ব্যবহার এবং বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় কত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন, তার ভিত্তিতে। তিনি আরও বলেন, ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমানোও অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ জন্য ঢাকার আশপাশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে, যেন মানুষ বাড়ির কাছেই চিকিৎসা নিতে পারেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় হাসপাতালকে অগ্রাধিকার দেওয়া অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের নিজ জেলা ও নির্বাচনী এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা অন্যায্য হবে। এতে মানুষের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে না।
