নদীবাহিত পলি জমে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। কোথাও বিস্তৃত হচ্ছে ভূমি, সমুদ্রের বুকে গড়ে উঠছে নতুন জনপদ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮৫টি চর রয়েছে।
নদীগুলো প্রতিবছর প্রায় ১৮০ থেকে ২৫০ কোটি টন পলি বহন করে
উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮৫টি চর রয়েছে
অনেক ডুবো চর রয়েছে যা এখনও নথিভুক্ত হয়নি
নদীবাহিত পলি জমে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। কোথাও বিস্তৃত হচ্ছে ভূমি, সমুদ্রের বুকে গড়ে উঠছে নতুন জনপদ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮৫টি চর রয়েছে। এছাড়াও আরও অনেক ডুবো চর রয়েছে সাগরে যা মাছধরা জেলেদের মুখে শুনা যায় এবং সরকারি হিসেবে এখনও নথিভুক্ত হয় নি। বাংলাদেশের নদীগুলো মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (জিবিএম) নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ১৮০ থেকে ২৫০ কোটি টন পলি বহন করে আনে। এই বিপুল পরিমাণ পলি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সঞ্চিত হয়ে নতুন চর ও দ্বীপ গঠনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর যে বালু উৎপাদন হয় তার আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, গত ৫০ বছরের বালুকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে বৃহত্তর চট্রগ্রামের সমপরিমাণ ভূমি সাগরে বৃদ্ধি করা সম্ভব হতো। নদী থেকে উত্তোলিত বালু, মেঘনা মোহনায় পলি সঞ্চয়, নতুন চর গঠন এবং বিদ্যমান চরগুলোর মধ্যে পরিকল্পিত সংযোগÑসব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরের বুকে ভূমি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মূল ভূখন্ডে জনসংখ্যা বাড়ছে, কৃষি জমি কমছে, জলাশয় কমছে, বনভূমি কমছে তাই আমাদের এখন সাগরে ভূখন্ড বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নদীভাঙন, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নথি, গবেষণার তথ্য, উপকূলের পরিবর্তনের চিত্র এবং পরিবেশ ও নদী বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এইসব তথ্য।
২০১০ সালে প্রকাশিত “উড়িরচরে ভূমিক্ষয় ও নতুন ভূমি গঠনের চিত্র: বাংলাদেশের উপকূলের পরিবর্তন’’ গবেষণায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮৫টি চর শনাক্ত করা হয়েছিল। গবেষণাটিতে চরগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়: সামুদ্রিক ও মোহনার দ্বীপ ৭২টি চর, মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত নদীচর ৯২টি, মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন নদীচর ২১টি।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) গবেষক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান, মো. নাজমুল আজিম বেগ এবং জহিরুল হক খানের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সময়কালে শুধু মেঘনা মোহনাতেই নিট পলি জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং বার্ষিক গড় প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত উত্তর বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকার নিট ভূমির পরিমাণ প্রায় ৫৯০ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ভাসানচর, উড়িরচর, চর নিজাম ও জাহাজের চরের মতো এলাকায় ভূপ্রকৃতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও নতুন চর গঠনের প্রমাণ মিলেছে।
ফেনী মোহনার উপকূলীয় পরিবর্তন নিয়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. বখতিয়ার রশীদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহমান-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৮ সালে এই মোহনার দ্বীপগুলোর মোট আয়তন ছিল প্রায় ৩৭৭ বর্গকিলোমিটার, যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬৩ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপগুলোর আয়তন প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৪.৬৪ বর্গকিলোমিটার হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সাথে নদীভাঙন ও সাইক্লিকের প্রভাবে কিছু পুরোনো ভূমি বিলীনও হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বালুর চাহিদা অপরিসীম। এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে সোমেশ্বরী নদী নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ওই নদী থেকে বছরে প্রায় ২৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট (প্রায় ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার) বালু বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলিত হয়, যার আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১৮.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে অতিরিক্ত বা অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, গভীর গর্ত সৃষ্টি এবং ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নদীটির প্রায় ৩১ হেক্টর নিট ভূমিক্ষয় শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকেরা স্যাটেলাইট চিত্র, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, বালুর নমুনা পরীক্ষা, স্থানীয় পরিবারের ওপর জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার ব্যবহার করেছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে বাংলাদেশের নদীগুলো থেকে মোট কত বালু উত্তোলন করা হয়েছে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়ি ন। তবে সোমেশ্বরী নদীর গবেষণায় উল্লেখিত বার্ষিক পরিমাণের ভিত্তিতে একটি গাণিতিক উদাহরণ দেওয়া যায়। বছরে ২৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট করে উত্তোলন যদি টানা ৫০ বছর একই হারে চলত, তাহলে মোট পরিমাণ দাঁড়াত ১৪ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৪১ কোটি ৯০ লাখ ঘনমিটার। হিসাবটি বোঝার জন্য ধরা যাক, কোনো স্থানে গড়ে এক মিটার পুরু করে বালু ফেলে ভরাট করা হবে। সে ক্ষেত্রে এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় ভরাট করতে লাগবে ১০ লাখ ঘনমিটার বালু। সোমেশ্বরী নদীর গবেষণায় উল্লেখিত বছরে প্রায় ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার বালুর পরিমাণ দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে এক মিটার পুরু করে প্রায় ৮.৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভরাট করা সম্ভব। অর্ধমিটার পুরুত্বে একই আয়তন দিয়ে প্রায় ১৬.৮ বর্গকিলোমিটার এবং দুই মিটার পুরুত্বে প্রায় ৪.২ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভরাটের হিসাব পাওয়া যায়। এই হিসাবের অর্থ এই নয় যে, সোমেশ্বরী নদীর বালু দিয়ে প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে ওই পরিমাণ স্থায়ী ভূমি তৈরি করা যাবে। এটি কেবল আয়তনভিত্তিক গাণিতিক হিসাব। সমুদ্রের তলদেশের গভীরতা, ভূমির উচ্চতা, ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, স্রোত, বালুর দানার আকার, বসে যাওয়া, ক্ষয় এবং ভূমি স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা বিবেচনায় নিলে প্রকৃত ফল ভিন্ন হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, নদীর গতিপথ এবং উপকূলীয় ভূমির পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণার মধ্যে সন্দ্বীপ দ্বীপের উপকূলরেখার পরিবর্তন ও ভাঙন-গঠনের বিবর্তন রয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে নতুন ভূমি গঠনের সম্ভাবনা মূল্যায়নের সময় শুধু কোনো চরের আয়তন বাড়ছে কি না, তা দেখলে চলবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে কোথায় ভাঙন হচ্ছে, কোথায় পলি জমছে এবং স্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণে ভূমির আকৃতি কীভাবে বদলাচ্ছে। সাগরে একটি চরের সাথে অন্য চরের মধ্যে কৃত্রিম ড্যাম বাঁধ সৃষ্টি করে অথবা নদীর পানির প্রবাহ ঘুরিয়ে দিয়ে সাগরের চরের আয়তন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক এলাকায় নতুন ভূমি জাগলেও অন্য এলাকায় ভাঙন চলতে পারে। তাই উপগ্রহচিত্র, দীর্ঘমেয়াদি উপকূলরেখার মানচিত্র এবং নদী-সমুদ্রের গতিপ্রকৃতির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, বঙ্গোপসাগরের নতুন ভূমি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: শুধু ভূমি জাগানোই কি যথেষ্ট, নাকি সেই ভূমির সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বসতি পরিকল্পনাও নিশ্চিত করতে হবে? নতুন চর বা দ্বীপে অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে নদীর বালুর সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারলে সাগরে ভূমি বাড়ানো সম্ভব। এবং এটা করার দরকারও যেভাবে মূল ভূখন্ডে জনসংখ্যা বাড়ছে, কৃষি জমি কমছে, জলাশয় কমছে, বনভূমি কমছে তাই আমাদের এখন সাগরে ভূখন্ড বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
নদী থেকে বালু উত্তোলনের পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে নদী-পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক শরীফ জামিল বলেন, “যেকোনো নদী থেকে বালু উত্তোলন করতে তার আগে যথাযথভাবে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা করতে হয়। আমাদের দেশে তা সঠিকভাবে করা হয় না। কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়া বালু উত্তোলন করলে নদীভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, নদী থেকে বালু তুলে সেই বালু দিয়ে উপকূলীয় এলাকায় জমি ভরাট করা সম্ভব কি না, তা শুধু বালুর পরিমাণ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বালু কোথা থেকে তোলা হচ্ছে, উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও তীরের উপর তার কি প্রভাব পড়বে, নদীভাঙন বাড়বে কি না এবং পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বেÑএসব বিষয় আগে যাচাই করতে হবে। একদিকে নতুন ভূমি তৈরির সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে নদীর তীর, বসতি, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হলে সেই প্রকল্পের সামগ্রিক সুফল প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই বালু উত্তোলনকে ভূমি উন্নয়নের সহজ উৎস হিসেবে না দেখে, নদীভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ২০২৬ সালে প্রকাশিত সোমেশ্বরী নদীতে বালু উত্তোলনের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাববিষয়ক গবেষণার সহলেখকদের একজন। তিনি বলেন, গবেষণায় নদীর গতিপথের পরিবর্তন, গভীর খননের গর্ত, স্থানীয় পরিবেশ এবং মানুষের জীবিকা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ভূমি বৃদ্ধি করতে হলে সতর্কতার সাথে নদী থেকে বালু উত্তোলন করতে হবে এবং সাগরের চরগুলোর সাথে কৃত্রিম ড্যাম বাঁধ তৈরি করে নতুন চর বৃদ্ধি সম্ভব। এইসব নতুন চরে কেউড়া গাছ লাগিয়ে ভূমি বৃদ্ধি সম্ভব হতে পারে।
