সাম্প্রতিক গবেষণায় ঢাকা শহরের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। এ শহরে সবুজের পরিমাণ কমছে, কংক্রিটের পরিমাণ বাড়ছে। রয়েছে নানারকম দূষণ। এটি ঢাকাবাসীর জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়। এমন অবস্থায় তিলোত্তমা ঢাকার স্বপ্ন যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। নগরবিশারদরা বলছেন, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক, সবুজ চত্বর এবং দূষণমুক্ত বায়ু থাকলে নাগরিকের প্রায় অর্ধেক রোগ-ব্যাধি কমে যেতে পারে। তাদের মতে, ক্রমেই রাজধানী ঢাকার চরিত্রবদল ঘটছে। বাড়ছে কংক্রিটের বোঝা, কমছে সবুজ আর ভয়কর রূপ নিচ্ছে বায়ুদূষণ। অস্বাস্থ্যকর নগরীতে মানুষের রোগ-ব্যাধি বাড়ছে, একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ফার্মেসি। নগর পরিকল্পনা ও সরকারের কর্মপরিকল্পনায় রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার ঝোঁক থাকাতে ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে এই নেতিবাচক পরিস্থিতি আর ঝুঁকিতে পড়ছেন ঢাকাবাসী।
সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সময়ের মধ্যে ঢাকায় সবুজের আচ্ছাদন কমেছে ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ; জলাশয় কমেছে ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে কংক্রিটের আচ্ছাদন বেড়েছে ৫০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০১৫ সালে ঢাকায় গাছপালার আচ্ছাদন ছিল ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭৮৪ দশমিক ১৯ হেক্টর। তা কমে ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৬০৮ দশমিক ৯৯ হেক্টর। সবুজের আচ্ছাদন কমেছে ১ হাজার ১৭৫ দশমিক ২০ হেক্টর বা ২ হাজার ৯০২ একর। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকায় বর্তমানে সবুজ এলাকার পরিমাণ মাত্র ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের জন্য ৯ বর্গমিটার সবুজ আচ্ছাদন থাকার কথা, জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ৩০ বর্গমিটার আর ঢাকা বিশদ অঞ্চল (ড্যাপ) অনুযায়ী ০ দশমিক ৬৫ শতাংশ সবুজায়ন থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সব মানদণ্ডের নিচে ঢাকার অবস্থান।
অপরিকল্পিত নগরায়ণে গাছপালা ও উন্মুক্ত স্থান কমে গেলে শহরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কংক্রিট ও পিচঢালা পৃষ্ঠের আধিক্যে তাপ জমে নগরে ‘হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। গাছের ছায়া, জলাশয় ও সবুজ এলাকা স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পরিকল্পনায় ক্রমাগত অন্যায্য আপস, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারী সংস্থাসমূহের ব্যর্থতা, আইনের প্রয়োগে সরকারি সংস্থাসমূহের অনীহা এবং জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতির কারণে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পরও ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না। এই মহানগরীর পরিকল্পনায় ক্রমাগত সংশোধন ও কাটাছেঁড়া, হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট বিনিয়োগ এবং দৃশ্যমান বড় বড় উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরও বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকার অবস্থান আবারও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে’ ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতার ক্রমাবনতির পেছনে ভুল উন্নয়ন দর্শন, সমন্বয়হীন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় রয়েছে। শহরের প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন এবং বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন মানসম্মত আবাসন এলাকা তৈরি, নাগরিক সুবিধাদির সার্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করা, পরিবেশ সুরক্ষা, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার ছিল। অথচ আমাদের উন্নয়ন ভাবনা কেবল কংক্রিটের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই প্রকল্পগুলো উল্টো জনগণের দুর্ভোগ ও পরিবেশ দূষণ বাড়িয়েছে।
কাগজে-কলমে ঢাকা সিটিতে ৪৪৫টি মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮৯টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ২৫৬টি। তবে এসব মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের বেশির ভাগই ব্যবহারের অনুপযোগী। বিশ্লেষকদের মতে, নগর পরিকল্পনায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মাঠ, পার্ক, গাছপালা, হাঁটার পথ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশকে জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় নগরের সবুজ এলাকার সঙ্গে শারীরিক সক্রিয়তা, মানসিক সুস্থতা এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমার প্রবল সম্ভবনার উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে সবুজ কমলেও হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাড়ছে; চিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে। কিন্তু নগরবাসীর সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ, পার্ক, গাছপালা ও পরিচ্ছন্ন উন্মুক্ত স্থান সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ঘনবসতি, বায়ুদূষণ, যানবাহনের শব্দ, অসহনীয় গরম এবং শরীরচর্চার জায়গার সংকটে নগরজীবন ক্রমেই স্বাস্থ্যের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থা সম্প্রসারণের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধবান্ধব নগর পরিকল্পনা জরুরি। কারণ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা পাওয়ার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অসুস্থতার ঝুঁকি কমিয়ে সুস্থ থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই মত বিশেষজ্ঞদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিভিন্ন গবেষণায় নগরের সবুজ এলাকার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পার্ক, খেলার মাঠ ও গাছপালাসমৃদ্ধ স্থান মানুষকে হাঁটাচলা ও ব্যায়ামে উৎসাহিত করে। মানসিক চাপ কমানো, অতিরিক্ত তাপ থেকে সুরক্ষা এবং শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রভাব কমাতেও এসব এলাকার ভূমিকা রয়েছে। তবে শুধু পার্ক থাকলেই সব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার উপযোগী পরিবেশ।
নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো ও খেলাধুলা স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। বিপরীতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন এসব রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বায়ুদূষণকে বিশ্বব্যাপী অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগের সঙ্গে হৃদরোগ ও স্ট্রোক জড়িত।
বিশ্লেষকদের মতে, রোগ প্রতিরোধে ওষুধের বিকল্প হতে পারে যদি নগর পরিকল্পনায় মাঠ, পার্ক, জলাশয় ও সবুজ এলাকার জন্য নির্ধারিত জায়গা সংরক্ষণ করা এবং দখলমুক্ত রাখা যায়।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি আমাদের সময়কে বলেন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং সবুজায়ন একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। দূষিত বাতাসে নানা ধরনের ক্ষতিকর কনা থাকে, দাহ্য জ্বালানি এবং বিভিন্ন ভারি ধাতুর উপস্থিতি থাকে। যার ফলে নবজাতক থেকে গর্ভবতী মা, যুবক বৃদ্ধ সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। যা থেকে শ্বাসকষ্ট, সিপিডির মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শব্দদূষণের কারণে কানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বধিরতার অন্যতম কারণ এই শব্দদূষণ। পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সবুজায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতাল স্থাপন করে রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তাই রোগমুক্ত সুস্থ জাতি গঠনে দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে ঢাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেকেলেই রয়ে গেছে। কারণ ঢাকা ওয়াসার পয়ঃবর্জ্য লাইন না থাকায় বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য খাল, ঝিল ও লেকের পানিতে ফেলা হচ্ছে। এমনকি ঢাকার চারদিকের নদীর পানিতেও যাচ্ছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। শুধু অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতিজনিত রোগের কারণে বিশ্বে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪ শতাংশ ঘটে থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের শিকারও হচ্ছে নগরবাসী। নগরে বিপুল জ্বালানি ব্যবহার, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং ভবন থেকে সৃষ্ট দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তীব্র তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মতো দুর্যোগ নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, দূষণের কারণে সংক্রমণ বাড়ছে। শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, অ্যালার্জি ও হৃদরোগ হচ্ছে। শিশুদের বিকাশ কমে যাচ্ছে। পানিদূষণের কারণে কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। সবুজ কমে যাওয়ার কারণে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ছে, অক্সিজেন কমছে। কাজেই যদি সবুজায়ন বাড়ানো যায়, হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, খেলাধুলার জন্য মাঠ ও পার্ক করা যায়, তাহলে অনেক রোগ এমনিতেই কমে যাবে।
