সিলেট: দেশের অন্যতম ও আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন পর্যটনের এলাকার একটি সিলেট। এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফাইভ স্টার, থ্রি স্টার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা। তবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের নামে এখানকার পাহাড় টিলা ও বনাঞ্চল উজাড় করে নীরবে-নিভৃতে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের এক ভয়ংকর মহোৎসব। পাহাড় ও টিলার বিভিন্ন জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ রিসোর্ট, যাকে ‘খুপরি’ বলেও ধরে নেওয়া যায়।
কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ নিয়ে একটি ঘর বানিয়ে নাম দেওয়া হচ্ছে ইকো রিসোর্ট, আবার কোথাও বনাঞ্চল উজাড় করে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে ঘর বানিয়ে হচ্ছে নাম দেওয়া হচ্ছে পরিবেশবান্ধব কটেজ। রিসোর্টে যাতায়াতের জন্য বনের ভেতরের গাছপালা উজাড় করে তৈরি করা হচ্ছে পথ। ফলে এসব বাণিজ্যিক স্থাপনা এখন সিলেটের পর্যটন খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিলেটের বিভিন্ন রিসোর্ট ঘুরে ও রাত্রিযাপন করে দেখা যায়, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি রিসোর্টগুলো দেখতে সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব মনে হলেও নেই নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা বর্হিগমন পথ। নেই ফায়ার লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। এমনকি অধিকাংশ রিসোর্ট নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে নেওয়া হয়নি কোনো অনুমোদনও।
বিশেষ করে, অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই সিসি ক্যামেরা ও নৈশপ্রহরী। রিসোর্টের মালিক নিজেই ম্যানেজার নিজেই হয়ে তা পরিচালনা করছেন। এতে করে এসব রিসোর্টের ভেতরে কী ঘটছে, তা কেউ জানেন না। ফলে পর্যটকদের জন্য লুকিয়ে আছে চরম নিরাপত্তাহীনতা। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটা রিসোর্টে অনভিপ্রেত একটি ঘটনার পর রাতারাতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনুমোদনহীন এ রকম শত শত রিসোর্টই পর্যটকদের জন্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর সরকারি ছুটি, ঈদ ও পূজা উৎসবে এসব রিসোর্টে শত শত পর্যটকের আগমন ঘটে এবং তারা রাত্রি যাপন করে। কিন্তু রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার মতো জরুরি সরঞ্জামাদি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতির কারণে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় পুরো দেশ যখন শোকে স্তব্ধ—ঠিক তখনই সিলেটের অবৈধ রিসোর্টগুলোর অন্ধকার দিক নিয়ে চলছে চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ। উন্মোচন হচ্ছে একের পর এক অনিয়ম। প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এসব স্থাপনা কীভাবে এতদিন পরিচালিত হচ্ছে, আর তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো কেন বছরের পর বছর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
অনুমোদন ছাড়াই চলছে ২ জেলার পর্যটন ব্যবসা
সিলেট জেলায় অন্তত সাড়ে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। তার মধ্যে জেলার শহরতলীতে অধিকাংশ হোটেল ও মোটেল, যার বেশিরভাগ আবার মাজারকেন্দ্রিক। বাকিসব রিসোর্ট শহরের বাইরে অবস্থিত। এ ছাড়া, এসব রিসোর্ট কারা চালাচ্ছে, বা কোনো বৈধতা আছে কি-না?- এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো দফতরে।
২০০৮ সালে মৌলভীবাজার জেলাকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর ২০১৩ সালে চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১৩ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করে সিলেট অঞ্চলের প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি-রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ। এরপরই জেলাজুড়ে শুরু হয় পাহাড়-টিলা কেটে ইকো রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের মহোৎসব।
গত ২৫ বছরে জেলাজুড়ে রিসোর্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০টিতে। তার মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট। বিশেষ করে শহরতলীর ট্যুরিস্ট পল্লী নামে খ্যাত রাধানগর এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, শুধু এই এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৫০টি ইকো রিসোর্ট। নামে বেনামে বেপরোয়া ভাবে এসব স্থাপনা ও পর্যটকের সমাগম বাড়তে থাকায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও চা– বাগানসহ আশপাশের বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রিসোর্ট নির্মাণে যারা জড়িত
রিসোর্ট নির্মাণে স্থানীয়দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকার বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানি, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রিয় অভিনেতা, ক্রিকেট তারকাসহ নামে-বেনামে এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। অনেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন শতক জমি কিনে রিসোর্টের নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন। অথবা জমি টিলা লিজ নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন পর্যটন ব্যবসা।
মূলধারার বৈধ রিসোর্ট মালিকদের ক্ষোভ
দেশে পর্যটন ব্যবসায় উন্নতির ছোঁয়া ও গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি বদলের সাথে সাথে শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকার বসতভিটাগুলো এখন ইকো রিসোর্টে পরিণত হয়েছে। কোনো ধরনের আইনের তোয়াক্কা না করে, রাধানগর গ্রামের স্থানীয়রা নিজ বসতভিটার কয়েকটি কক্ষের আসবাবপত্র পরিবর্তন করে সাজিয়ে-গুছিয়ে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য রিসোর্ট। কোথাও কোথাও টিলা কেটে, বা বনাঞ্চল জ্বালিয়ে উজাড় করে, ছোট স্থাপনা নির্মাণ করেই নাম দেওয়া হচ্ছে ইকো-রিসোর্ট।
এসব রিসোর্টের বৈধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলছেন বৈধ রিসোর্ট মালিকেরা। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদফতর ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। তার মতে, পুরো শ্রীমঙ্গলে বৈধ রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫টির বেশি হবে না।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কাছে বলেন, ‘বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, আমাদের জেলায় প্রায় ২০০টি রিসোর্ট। এসব রিসোর্টের মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০টির বেশি আছে। কীভাবে এত রিসোর্ট হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। অথচ প্রকৃত অর্থে শ্রীমঙ্গলে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি বৈধ রিসোর্ট আছে, যাদের রিসোর্ট বলা যায়। অনেকেই তিন-চারটা কক্ষ নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন। এসব রিসোর্ট কারা করছেন, তা আমাদের জানা নেই।’
সেলিম আহমদ জানান, শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬০টি রিসোর্ট। একটি রিসোর্ট করতে বিন্দুমাত্র অনুমতি যদি কারও নিতে হতো, তাহলে এর সংখ্যা কমে আসত। সরকারি নিয়ম মেনে কর দিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, তারা নামসর্বস্ব এসব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর বনজীবী, বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক ও বিদেশি পর্যটকরা আসতে থাকেন বন ভ্রমণে। প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদের রাত্রীযাপনের জন্য ‘নিসর্গ ইকো কটেজ’ নামে প্রথম কটেজ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে লাউয়াছড়া আর চা-বাগান কাছে থাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি হয় সিলেট অঞ্চলের প্রথম পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট। সেই রিসোর্টকে অনুসরণ করেই একের পর এক গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক রিসোর্ট।
ছাড়পত্র নিয়েছে ৬০টি রিসোর্ট
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘অধিদফতর থেকে প্রায় ৬০টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ মামলা করা হয়েছে। যেসব রিসোর্ট ২০ কক্ষ বা তার অধিক, এসব রিসোর্টের ছাড়পত্র আমরা দিই। বাকি রিসোর্টগুলো কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে এসব আমাদের জানা নেই।’
অবৈধ রিসোর্টের বিরুদ্ধে প্রশাসনের উদ্যোগ
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘টিলা বা পাহাড় কাটার অভিযোগ পেলে প্রশাসন তা খতিয়ে দেখে। উপজেলা বর্তমানে কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, সেগুলোর ভূমির মালিকানা, অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা কী- এসব তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। জমি বা টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন না থাকলে তা করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং সম্প্রতি নিয়ম অমান্য করায় দু’টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্টগুলো আমরা দেখাশোনা করি। যারা রিসোর্ট করছেন, হয়তো তারা কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমতি নিচ্ছেন। আবার না-ও নিতে পারেন। এসব বিষয় জানা নেই।’
পরিবেশ অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘যেসব রিসোর্ট বা হোটেলে ন্যুনতম ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়, সেগুলোর ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদফতর দিয়ে থাকে। এর চেয়ে কম বাজেটের কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আমরা দিই না।’ লোর অনুমোদন দেওয়া হয় সেগুলোতে নিয়মিত তদারকি করা হয় বলে দাবি তার।’
এদিকে প্রকৃতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক মহল ও পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, ‘ইকো রিসোর্ট’ নাম ব্যবহার করলেই কোনো স্থাপনা পরিবেশবান্ধব বা বৈধ হয়ে যায় না। পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল ধ্বংসের বিনিময়ে পর্যটনের বিকাশ হয় না। পর্যটনের উন্নয়নের জন্য রিসোর্ট নির্মাণের প্রয়োজন থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে জমির অবস্থান, প্রকল্পের ধরন ও আয়তন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া জরুরি।
