'কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানিনা তা/নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা। দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা/তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
'কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানিনা তা/নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা। দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা/তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না? সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ/অচল ছবি সে, তসবীর যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ। কথাগুলো শুনলে যার নাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিনি হলেন মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ।
আজ ১৯ অক্টোবর, রোববার মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের এই দিনে ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনে বাংলা সাহিত্যের তুমুল জনপ্রিয় এই কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামী ভাবধারার বাহক হলেও তার কবিতার প্রকরণকৌশল ও শব্দচয়ন ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার নানান সৌকর্য তার কবিতায় পরিব্যাপ্ত। রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতায় ফররুখ আহমদের সৃষ্টিশীলতা মৌলিক বলে সর্বজন স্বীকৃত।
কবি বলেছেন, রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?/ এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? /সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে? / তুমি মাস্তুলে আমি দাঁড় টানি ভুলে; / অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি...
ফররুখ ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অণুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। কবির কলম অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিল। জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কবি মানবতা ও সাম্যের জয়গান গেয়েছেন।
ফররুখ ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্ম মর্যাদাবান ও অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা তার কবিতায় দৃশ্যমান ছিল। তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, আইয়ুব শহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলন প্রভৃতি সব স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার।
কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আলী। মাতা বেগম রওশন আখতার। তিনি ছিলেন সাম্যের কবি, দারিদ্র্েযর কবি ও নিপীড়িত মানবতার কবি। স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতিও কবির অনুরাগ ছিল অগাধ। তবে এই অনুরাগ বা ভালবাসা কবিকে কখনও বিশ্বমানব কল্যাণ কামনায় বিরত করেনি।
তিনি ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও পরীক্ষা না দিয়েই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মাদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও স্থায়ীভাবে চাকরি করতেন ঢাকা বেতারে। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন লিলিকে বিয়ে করেন তিনি।
সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও ফররুখ আহমদের কবি পরিচিত ছিল প্রধান। তার রচনায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব দেখা যায়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্য সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), হাতেমতায়ী (১৯৬৬) ইত্যাদি। পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০) ইত্যাদি তার শিশুতোষ রচনা।
তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেসকো পুরস্কার (১৯৬৬), মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) লাভ করেন।
