পিন্টারেস্টে হয়ত ব্যবহারকারীর গাড়ির ভেহিকল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা শ্যাসি নম্বর কোনো কাজে লাগে না তবে জেনারেল মোটর্সের বিভিন্ন অ্যাপ ঠিকই সেখানে তা পাঠিয়ে দিচ্ছে।
কেবল পিন্টারেস্টই নয়, স্ন্যাপ, ইয়াহু, মেটা, গুগল ও ডেটা ব্রোকার অ্যাক্সিওমের মতো বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও এই তথ্য পাচার হচ্ছে। ‘নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘কনজিউমার রিপোর্টস’-এর গাড়িবহর ব্যবহার করে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অগাস্টের মধ্যে আধুনিক মডেলের ২১টি গাড়ি ও ৩০টি অটোমেকার অ্যাপের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, পরীক্ষা করা বিভিন্ন গাড়ির মধ্যে ১৯টি গাড়িই ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে অন্তত একটি থার্ড পার্টির কোম্পানির কাছে ডেটা পাঠিয়েছে।
এ ছাড়া, পরীক্ষিত বিভিন্ন অ্যাপের মধ্যে সাতটি অ্যাপ ভিআইএন, ইমেইল ঠিকানা ও নির্ভুল বা সুনির্দিষ্ট অবস্থানের মতো সংবেদনশীল পরিচয় বা আইডেন্টিফায়ার বিজ্ঞাপন ও অ্যানালিটিক্স কোম্পানিগুলোর কাছে পাচার করেছে।
এ সাতটি অ্যাপের মধ্যে চারটিই জেনারেল মোটর্স বা জিএম-এর। জানুয়ারি থেকে মার্কিন ‘ফেডারেল ট্রেড কমিশন’ বা এফটিসি’র ২০ বছর মেয়াদী এক প্রাইভেসি সুরক্ষা আদেশের অধীনে রয়েছে জিএম।
জিএমের চারটি অ্যাপ হচ্ছে মাইক্যাডিলাক, মাইশেভ্রোলে, মাইবুইক ও মাইজিএমসি। এসব অ্যাপের প্রতিটি মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবিসহ মোট ১০টি কোম্পানির কাছে গাড়ির ভিআইএন নম্বর পাঠিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, হন্ডালিংক অ্যাপটি অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘অ্যামপ্লিটিউড’-এর কাছে ভিআইএন ও লোকেশন পাঠিয়েছে। বাকি তালিকায় রয়েছে লিংকন ও মাইনিসান অ্যাপ।
তবে ফোনের বিজ্ঞাপন আইডি রিসেট করা গেলেও একটি ভিআইএন বা শ্যাসি নম্বর কখনও রিসেট করা যায় না। ফলে ভিআইএন নম্বরের সঙ্গে ইমেইল ঠিকানা মেলানো সম্ভব হলে বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলোর পক্ষে সহজেই গাড়ির মালিকের অন্যান্য অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের কার্যকলাপ ট্র্যাক করা সম্ভব হয়।
‘কনজিউমার রিপোর্টস’-এর গাড়িভিত্তিক সারসংক্ষেপ অনুসারে, পরীক্ষা করা ২১টি গাড়ির মধ্যে ১০টি গাড়ি নিজে থেকে কোনো বিজ্ঞাপন বা ট্র্যাকিং ডোমেইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
‘বুইক এনভিস্টা’ ও ‘নিসান আরিয়া’ গাড়ি দুটি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব গাড়ির সঙ্গে যোগ মোবাইল অ্যাপগুলো ব্যবহার করার ফলে মালিকদের প্রাইভেসি ২৩টি ও ২৫টি বিজ্ঞাপন ও ট্র্যাকিং কোম্পানির কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে, টেসলা সম্পূর্ণ উল্টো পথ হেঁটেছে। টেসলা মডেল ৩ গাড়িটি সরাসরি ২২টি বিজ্ঞাপন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আর এর মোবাইল অ্যাপটি যোগ করেছে আরও দুটি কোম্পানিকে।
গবেষক দলটি বলেছে, গাড়ির ভেতরের ট্রাফিক এনক্রিপ্টেড থাকায় তারা সেটি বিশ্লেষণ করতে পারেননি এবং মডেল ৩ থেকে কেবল সেলুলার ডেটা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে এসব গাড়ির প্রকৃত ডেটা ফাঁসের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ গাড়ির ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপনী প্রযুক্তির সঙ্গে ডেটা ফাঁসের মূল উৎস ছিল ফোন অ্যাপগুলো।
এদিকে, কনজিউমার রিপোর্টসের তথ্য বলছে, পরীক্ষা করা ৩০টি অ্যাপের মধ্যে ২৮টি অ্যাপই অন্তত একটি বিজ্ঞাপন বা অ্যানালিটিক্স কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
জানুয়ারিতে ড্রাইভারের ডেটা শেয়ারিং কেলেঙ্কারির ঘটনায় জেনারেল মোটর্সের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তি ঘোষণা করেছিল মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশন বা এফটিসি।
ওই আদেশে কোম্পানিটিকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ভোক্তা প্রতিবেদন নির্মাতা কোম্পানিগুলোর কাছে চালকদের ডেটা বিক্রি করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
একইসঙ্গে বলা হয়েছিল, চালকদের সঙ্গে সংযোগ গাড়ির ডেটা সংগ্রহ বা শেয়ার করার আগে জিএম’কে অবশ্যই তাদের স্পষ্ট বা সুস্পষ্ট অনুমতি নিতে হবে। তবে ‘নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র গবেষণাটি এফটিসি’র সেই আদেশ জারির আগের সময়ে পরিচালিত হয়েছিল এবং গবেষকরাও সে সময় কোনো আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেননি।
এদিকে, নর্থইস্টার্ন গ্লোবাল নিউজকে জিএম বলেছে, তারা কেবল সেইসব সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গেই ডেটা শেয়ার করে যারা এমন চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে যার ফলে তারা ডেটা বিক্রি করতে পারবে না।
এসব বিষয় ছাড়াও গবেষকরা তাদের গবেষণার ফলাফল নিয়ে ১৭টি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এর মধ্যে ১৪টি থেকে প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন।
এসব কোম্পানির সবাই দাবি করেছে, ডেটা স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়া তাদের বিক্রয় চুক্তির সঙ্গে মেলে। এর মধ্যে সাতটি কোম্পানি বলেছে, গাড়িতে থাকা প্রি-ইনস্টল করা সফটওয়্যারসহ যে কোনো থার্ড পার্টির সেবার শর্তাবলী পড়া ও তা গ্রহণ করার চূড়ান্ত দায়িত্ব একান্তই গাড়ির মালিকের।
অন্যদিকে, পাঁচটি কোম্পানি তাদের অ্যাপের ভেতরে খোলা বিভিন্ন ওয়েব পেইজকে এই ট্র্যাকিংয়ের জন্য দায়ী করেছে।
গবেষকরা এমন সাতটি অ্যাপের প্রাইভেসি নীতিও খতিয়ে দেখেছেন, যেগুলো ব্যবহারকারীকে ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তকরার মতো তথ্য বা আইডেন্টিফায়ার শেয়ার করত।
তারা বলেছেন, প্রতিটি অ্যাপই কোনো না কোনোভাবে থার্ড পার্টির কাছে ব্যক্তিগত ডেটা পাঠাতে পারে বলে তাদের নীতিমালায় উল্লেখ রেখেছে। তবে তারা নির্দিষ্ট করে বলেননি যে ঠিক কোন কোম্পানিগুলোর কাছে বা কী কারণে ডেটা পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, রিভিয়ান বলেছে, ডেটা সংগ্রহ বন্ধ রাখলে ন্যাভিগেশন ও ‘ওভার-দ্য-এয়ার’ আপডেট দেওয়ার মতো বিভিন্ন ফিচার সীমিত বা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।
তবে হন্ডা’কে এই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ইতিবাচকভাবে বদলানোর উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। তারা ‘অ্যামপ্লিটিউড’ কোম্পানিকে লোকেশন ডেটা মুছে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছে এবং হন্ডারক অ্যাপ আপডেট করে এই ডেটা পাঠানো বন্ধ করেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হন্ডার একজন মুখপাত্র।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাদের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন ‘নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-লেখক ডেভিড শফনেস।
