ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের আধিপত্যে ধাক্কা দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দৌড়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা। এবার জটিল সমীকরণ সমাধান, নিখুঁত প্রোগ্রামিং কোডিং এবং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তির সুবিধা নিয়ে ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ (Muse Wonder) ও ‘মিউজ ওয়ান্ডার ফুল’ (Muse Wonder Full) নামে দুটি শক্তিশালী এআই মডেল উন্মোচন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তিভিত্তিক সাময়িকী টেকক্রাঞ্চ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার মেটার ‘সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব’ এই নতুন মডেল দুটি সামনে আনে। মেটা দাবি করছে, পারফরম্যান্সের বিচারে তাদের এই নতুন মডেল বাজারে থাকা ‘জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা’ এবং ‘ফেবল ৫.১’-এর মতো বিশ্বসেরা মডেলগুলোর একদম কাছাকাছি সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে।
হালকা মডেল থেকে জটিল প্রযুক্তির পথে মেটা
এতদিন মেটা মূলত কম সময়ে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম ও হালকা এআই মডেল তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিল। যেমন, প্রতিষ্ঠানটির পূর্বে প্রকাশিত ‘মিউজ স্পার্ক’ (Muse Spark) মডেলটি দ্রুত উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে নতুন উন্মোচিত ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ মডেলগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো তুলনামূলক বড় এবং জটিল ও বহুমুখী কাজ সামলানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
গত বছরের আগস্টে মেটা তাদের এআই বিভাগ পুনর্গঠন করার পর এটিই ছিল উন্নত কোনো মডেল প্রকাশের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোকে সরাসরি টেক্কা দিতে চাইছে।
নতুন এআই মডেলের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
দীর্ঘমেয়াদী ‘অ্যাকটিভ মেমোরি’: মডেলগুলোর প্রধান আকর্ষণ হলো ‘অ্যাকটিভ মেমোরি’ বা সক্রিয় স্মৃতিশক্তি। মেটার গবেষক কাভিয়া কোপারাপু জানান, ব্যবহারকারীর প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিন, সপ্তাহ বা মাসজুড়ে মনে রাখার সক্ষমতায় জোর দেওয়া হয়েছে।
‘মেমোরিবেঞ্চ’ পরীক্ষায় সাফল্য: দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য শেখা ও মনে রাখার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত ‘মেমোরিবেঞ্চ’ পরীক্ষায় নতুন এই মিউজ ওয়ান্ডার মডেলটি বাজারের অন্য জনপ্রিয় এআই মডেল (যেমন, ফেবল, ওপাস ও অ্যাস্ট্রা)-কে পেছনে ফেলে উচ্চ স্কোর অর্জন করেছে।
জটিল কোডিং ও যুক্তিভিত্তিক কাজ: কোড লেখা এবং জটিল তথ্যের বিশ্লেষণ করে দ্রুত সমাধান দিতে এটি অত্যন্ত দক্ষ।
পারফরম্যান্স, দাম ও ব্যবহারের সুবিধা
মেটার নিজস্ব টেস্ট বা মডেল কার্ড অনুযায়ী, বেশ কিছু মানদণ্ডে নতুন মডেলগুলোর পারফরম্যান্স ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা’ এবং অ্যানথ্রপিকের ‘ফেবল ৫.১’-এর কাছাকাছি। তবে এটি মেটার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফল, স্বাধীনভাবে পরীক্ষা ও যাচাই করা এখনও বাকি।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত মেটার শক্তিশালী ‘প্রমিথিউস ডেটা সেন্টারে’ এই মডেল দুটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এগুলো ব্যবহারের শর্তাবলীতে কিছু পার্থক্য রয়েছে…
মিউজ ওয়ান্ডার (Muse Wonder): এটি সাধারণ ডেভেলপারদের জন্য এপিআই (API)-এর মাধ্যমে উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রতি ১০ লাখ ইনপুট টোকেনের জন্য ৪ ডলার এবং প্রতি ১০ লাখ আউটপুট টোকেনের জন্য ২০ ডলার খরচ পড়বে।
মিউজ ওয়ান্ডার ফুল (Muse Wonder Full): এটি এপিআই-এর মাধ্যমে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না। মডেলটি শুধু মেটার ‘মিউজ কোড’ গ্রাহক ও অভ্যন্তরীণ এআই এজেন্টগুলোকে শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহৃত হবে।
এতদিন পর্যন্ত মেটা মূলত কম খরচে দ্রুত কাজ করা ছোট বা হালকা এআই মডেল তৈরিতে জোর দিলেও, ‘মিউজ ওয়ান্ডার’ প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেল যে তারা এখন প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ জটিল এআই প্রতিযোগিতায় সরাসরি নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় টেক্কা দিলেও, সাধারণ ব্যবহারকারী ও স্বাধীন গবেষকদের হাত ধরে বাস্তবে এই মডেলগুলো কতখানি কার্যকর প্রমাণিত হয়-এখন সেটাই দেখার বিষয়।
