ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের পূজাম-পগুলো। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাল শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে মায়ের আগমনী বার্তা ও দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। এরপর থেকেই ভক্তরা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এখন চলছে উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
হিন্দুদের সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই মন্দির ও পূজাম-পগুলোয় থাকে নানা আয়োজন। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে ম-প সাজানো, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থাÑ সবকিছু নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেন আয়োজকেরা। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রস্তুতির গতি। ইতোমধ্যে দেশের অধিকাংশ পূজাম-পে প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ মুহূর্তে। কোথাও চলছে আলোকসজ্জার কাজ, কোথাও প্রতিমা ও ম-পের সৌন্দর্যবর্ধন। পূজা ঘিরে বাজারগুলোয়ও বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শিশুদের পছন্দের জিনিস কিনতে ব্যস্ত বিভিন্ন বয়সি মানুষ। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হওয়ার পর থেকেই ভক্তদের অপেক্ষা ছিল মহাষষ্ঠীর। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কাল মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। এদিন সকালে ষষ্ঠীপূজা ও সন্ধ্যায় দেবী দুর্গার বোধন হবে। বোধন শব্দের অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্ত। শরৎকালের দুর্গাপূজায় এ বোধন করার বিধান রয়েছে। বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে রাক্ষসরাজ রাবণকে বধের উদ্দেশ্যে দুর্গাপূজা করেন। তিনি অকালে এ বোধন করেন বলেই এটি অকালবোধন নামে খ্যাত।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার মহাসপ্তমী পূজায় ব্যতিক্রম ঘটছে। তিথি অনুযায়ী এবার পরশু শনি ও রোববার দুদিন মহাসপ্তমীর পূজা হবে। এরপর সোমবার মহাষ্টমী ও মঙ্গলবার মহানবমী পূজা হবে। পরদিন বুধবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পূজার মূল আয়োজন। পূজার প্রতিটি দিনেই ম-পে ম-পে দেবীদর্শন, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, আরতিসহ নানা ধর্মীয় আচার পালন করবেন ভক্তরা। পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১ ম-পে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫ ম-পে পূজা হয়েছিল। সে হিসাবে এবার ম-প বেড়েছে ৪৯৬টি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার আসার পর জনমনে আস্থা বেড়েছে। তাই পূজাম-পের সংখ্যাও বেড়েছে। এবার দীর্ঘ ছুটিতে মানুষের অংশগ্রহণও বাড়বে। তাই দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তার স্বার্থে ম-পে সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’ ইতোমধ্যে পূজা উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এবার পূজায় টানা ৫ দিনের ছুটি থাকছে।
দুর্গোৎসব সামনে রেখে পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছে মানুষ। রাজধানীর বিপণিবিতান, শপিং মল ও স্থানীয় বাজারগুলোয় উৎসবের কেনাকাটা ঘিরে বাড়ছে ক্রেতাদের উপস্থিতি। শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন পোশাক, পরিবারের সদস্যদের উপহার এবং পূজার দিনগুলোয় পরার জন্য পছন্দের পোশাক কিনছেন অনেকে।
দুর্গাপূজা উদযাপনে ৫ পরামর্শ পুলিশের : শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজক, দর্শনার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য পাঁচটি নিরাপত্তা পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গুজবের সত্যতা যাচাই না করে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার না করা; পূজাম-পের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থা রাখা। ম-পে ব্যাগ, থলে বা পোঁটলা নিয়ে প্রবেশ না করা; পূজাম-পে সিসিক্যামেরা ও অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র স্থাপন নিশ্চিত করা। গুরুত্বপূর্ণ ম-পে আর্চওয়ে গেট স্থাপন করা। ম-প ও প্রতিমা বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা। সম্ভব হলে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর বা চার্জার লাইটের ব্যবস্থা রাখা। পূজাম-পের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা ও সাম্প্রদায়িক সম্পীতি বজায় রাখতে আজান ও নামাজের সময় মসজিদের পার্শ্ববর্তী পূজাম-পে পূজা চলাকালে এবং বিসর্জনের সময় শব্দযন্ত্রের ব্যবহার সীমিত রাখা; স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত রুট ও স্থানে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ হেডকোয়াটার্স : (০২২২৩৩৮০৬৬১, ০২২২৩৩৮১৯৬৭, ০১৩২০০০১২৯৯, ০১৩২০০০১৩০০), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) : ০২২২৩৩৫৫৫০০, ০১৮১৭৬০২০৫০; ঢাকেশ্বরী মন্দির সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম : ০২৯৬১১৩৫৩, ০১৭০৫৫০৫৫২৯; এসআরবি কন্ট্রোল রুম: ০১৭৭৭৭২০০৯; ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুম: ০২২২৩৩৫৫৫৫৫, ০১৭১৩০৩৮১৮১, ০১৭১৩০৩৮১৮২, ০১৭৩০৩৩৬৬৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ (টোল ফ্রি) নম্বরে ফোন করে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা পাওয়া যাবে। পাশপাশি জেলা পুলিশ সুপার ও থানার অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) নম্বর জানতে বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট ভিজিটেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।