ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার উদ্বেগের মধ্যে বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এবারের নির্বাচনে ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভা (৬১) এবং দেশটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে গিউরভ (৫০)।
বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদ মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ায় এ পদের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। দেশটির প্রধান নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, আইনে ভেটো দিতে পারেন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেন।
বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার পর এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব হামলায় প্রায় দুই ডজন আন্তর্জাতিক নাবিকের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামলাগুলোর ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে মিত্রদের সহায়তা চেয়েছে বুলগেরিয়া।
হামলার জন্য রাশিয়াকে সরাসরি দায়ী করা থেকে বিরত রয়েছে বুলগেরিয়ার সরকার। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ বলেছেন, এসব হামলার ফলাফল ‘রুশ ফেডারেশনের জন্য লাভজনক’।
রাশিয়া ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভক্তি
প্রেসিডেন্ট পদে এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থীই ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।
চলতি বছর তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা গিউরভ পশ্চিমাপন্থি ও সংস্কারপন্থি দলগুলোর সমর্থন পাচ্ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি কিয়েভের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তিও সই করেন।
বৃহস্পতিবার এক নির্বাচনী সমাবেশে গিউরভ বলেন, ‘আমি চাই, ইউরোপে বুলগেরিয়ার নিজস্ব অবস্থান থাকুক। দেশটি এমন একটি নির্ভরযোগ্য ন্যাটো মিত্র হবে, যারা প্রস্তুতি, শক্তিশালী কূটনীতি ও সুস্পষ্ট অবস্থানের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে।’
অন্যদিকে, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োতোভা গত জানুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাদেভ পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পদত্যাগ করার পর তিনি এ দায়িত্ব পান। রাদেভ পরে পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্রেমলিনের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে মনে করেন।
রাদেভ ইয়োতোভাকে সমর্থন দিচ্ছেন। দুজনই কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের সমাবেশে ইয়োতোভা বলেন, ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা বলছেন, ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সত্য হলো, আমরাই সবাই সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত।’
পার্লামেন্টের দলগুলোর মধ্যে বুলগেরিয়ার পশ্চিমাপন্থি অবস্থান বজায় রাখার বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে দেশটিতে রুশপন্থি মনোভাবও প্রবল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এ নিয়ে দেশটির সমাজে বিভাজন আরও বেড়েছে।
জনমত জরিপ সংস্থা মার্কেট লিংকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডোব্রোমির ঝিভকভ বলেন, ইয়োতোভা তাদের মধ্যে অন্যতম, যারা বুলগেরিয়াকে আরও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার পক্ষে মত দেন।
তিনি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘তারা ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ এবং দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানান। প্রায়ই তাদের মুখে ক্রেমলিনের বক্তব্য ও প্রচারণা থেকে সরাসরি নেওয়া শব্দচয়ন শোনা যায়।’
দ্বিতীয় দফায় ভোটের সম্ভাবনা
নির্বাচনে প্রার্থীরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়েও ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক বুলগেরীয় নাগরিকের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আলফা রিসার্চের জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইয়োতোভা ৪১ শতাংশ এবং গিউরভ ২৮ শতাংশ ভোট পেতে পারেন।
রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে রাত ৮টায়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২৭ জন প্রার্থীর কেউই প্রথম দফায় সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন না। দেশটিতে নিবন্ধিত ৬৬ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের বেশি হওয়াও প্রয়োজন। তবে রোববার ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আগামী ১ নভেম্বর দ্বিতীয় দফার ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা