কালবেলা · সাধারণ
এনসিটির ইজারা বাতিলের দাবিতে বন্দরে গণঅনশন
১২/১০/২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণঅনশন ও বিক্ষোভ করেছেন বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চুক্তির স্বচ্ছতা প্রকাশ এবং বন্দর পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা। দাবি মানা না হলে আগামী ১৯ অক্টোবর আবারও অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের কাস্টমস ভবনের বিপরীতে বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনসংলগ্ন এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা, শ্রমিক নেতা ও সাধারণ কর্মচারীরা অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত ৮ অক্টোবর জনমত উপেক্ষা করে এবং বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পর বন্দর এলাকায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীরা গণঅনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
গণঅনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার কী যুক্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রস্তাবিত আধুনিকায়ন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলেই দেশের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা কীভাবে দূর হবে। তার মতে, আমদানিকারকদের পণ্যের মূল্য কম দেখানো, শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসে বিলম্ব, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে জটিলতা এবং বন্দরসংলগ্ন সড়কে যানজটের মতো সমস্যাগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা প্রয়োজন।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস ও নতুন কনটেইনার বোঝাই করার সময়ের সঙ্গে আমদানি করা পণ্য শুল্কায়ন ও খালাসের সময়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। এক হাজার থেকে তিন হাজার কনটেইনার বহনকারী একটি জাহাজের পণ্য খালাস ও নতুন কনটেইনার বোঝাই করে বন্দর ত্যাগ করতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগতে পারে। তবে আমদানি করা পণ্য খালাসের বিষয়টি শুল্কায়ন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়ার ওপরও নির্ভর করে, যা বন্দর কর্তৃপক্ষ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের জোয়ার-ভাটানির্ভর পরিচালনব্যবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য, শুধু টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার সব সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। বন্দরের কার্যকারিতা বাড়াতে সামগ্রিক অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
গণঅনশনে অংশ নেওয়া শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা দেওয়ার পর বন্দরে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীর কাজের ধরন ও চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। যে শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামে চট্টগ্রাম বন্দর আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে, তাদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনীতি, ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এনেছে। সরকার বন্দর পরিচালনায় আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার কথা বললেও চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য সুফল এবং কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আন্দোলনকারীদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়া যাবে না। বর্তমান কাঠামোতে অথবা দক্ষ দেশীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দর পরিচালনার পাশাপাশি কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, সরকারের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে।
তবে এ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗