মক্কার চরম প্রতিকূল পরিবেশ থেকে শুরু করে মদিনার স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং এর পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের জয়যাত্রার পেছনে সাহাবিদের দাওয়াতি অবদান ছিল অনন্য ও অবিস্মরণীয়।
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তী জীবনের মূল লক্ষ্যই ছিল তাওহীদের বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া। তবে এই সুমহান ও কঠিন দায়িত্ব এককভাবে নয়, বরং তাঁর একদল একনিষ্ঠ, অনুগত এবং আত্মোৎসর্গকারী অনুসারীর সহযোগিতায় সফল হয়েছিল—যাঁরা ইতিহাসে 'সাহাবী' নামে সমধিক পরিচিত। মহানবীর (সা.) নির্দেশ ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে দ্বীনের দাওয়াত বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মক্কার চরম প্রতিকূল পরিবেশ থেকে শুরু করে মদিনার স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং এর পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের জয়যাত্রার পেছনে সাহাবিদের দাওয়াতি অবদান ছিল অনন্য ও অবিস্মরণীয়।
মক্কী জীবনের দাওয়াতি তৎপরতা ও কৌশল
মক্কী জীবনে কুরাইশদের তীব্র বিরোধিতা, নির্যাতন ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সাহাবিদের দাওয়াতি কার্যক্রম মূলত দুটি প্রধান পর্যায়ে বা কৌশলে পরিচালিত হয়েছিল।
নবুয়তের প্রথম তিন বছর মহানবীর নির্দেশনায় সাহাবিগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেন। ইসলাম গ্রহণের পরপরই হযরত আবু বকর (রা.) মক্কার প্রভাবশালী ও উচ্চ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে গোপনে দাওয়াত নিয়ে যান। তাঁর একক প্রচেষ্টায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে হযরত উসমান (রা.), যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.), আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.), তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.) এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ইসলাম গ্রহণ করেন।
প্রকাশ্য দাওয়াতের পর কুরাইশদের অত্যাচার বেড়ে গেলে মহানবী (সা.) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকাম (রা.)-এর বাড়িকে ইসলামের প্রথম গোপন কেন্দ্র ও প্রচারকক্ষ হিসেবে বেছে নেন। সেখানে সাহাবিগণ গোপনে সমবেত হতেন, কুরআন শিখতেন এবং দাওয়াতি কাজের দীক্ষা নিতেন।
প্রকাশ্য দাওয়াতের নির্দেশ আসার পর সাহাবিগণ মক্কার কাফেরদের সামনে সরাসরি তাওহীদের বাণী তুলে ধরেন। হযরত আবু বকর (রা.) প্রথম ব্যক্তি যিনি কাবা প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কাফেরদের দ্বারা মারাত্মকভাবে জখম হন। একইভাবে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) প্রথম সাহাবি হিসেবে কাবা চত্বরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করে কুরাইশদের তাওহীদের দাওয়াত শোনান।
মক্কার কাফেরদের চরম অত্যাচার ও সামাজিক বয়কটের (শেবে আবী তালিবে বন্দিত্ব) জবাবে সাহাবিগণ কখনো পাল্টা আঘাত করেননি। হযরত বিলাল (রা.), হযরত খাব্বাব (রা.) এবং ইয়াসির (রা.)-এর পরিবারের চরম ধৈর্য ও সুউচ্চ চরিত্র দেখে মক্কার সাধারণ মানুষ ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল।
মাদানী জীবনের দাওয়াতি বিস্তার ও আন্তর্জাতিক রূপ
মদিনায় হিজরতের আগে ও পরে সাহাবিদের দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের আগেই সাহাবিদের মাধ্যমে সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। মহানবী (সা.) হযরত মুসআব বিন উমাইর (রা.)-কে মদিনার প্রথম ‘দাঈ’ বা দূত হিসেবে পাঠান। তাঁর চমৎকার আচরণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতের ফলে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলাম পৌঁছে যায় এবং হিজরতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মহানবী (সা.) বিভিন্ন দেশের রাজা ও বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াতপত্রসহ সাহাবিদের দূত হিসেবে পাঠান। যেমন—হযরত ডিহইয়া আল-কালবি (রা.) রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.) পারস্যের সম্রাট খসরুর দরবারে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান।
ইসলামের বিধিবিধান ও শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মহানবী (সা.) সাহাবিদের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষক হিসেবে পাঠাতেন। যেমন—হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-কে ইয়েমেনে ইসলামের দাওয়াত ও শিক্ষকতার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, যার ফলে সেখানকার পুরো হামদান গোত্র একদিনে ইসলাম গ্রহণ করে।
হিজরত ও দূরদেশে দাওয়াতি সফর
কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে এবং দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে সাহাবিদের হিজরত করা ছিল ইসলামের দাওয়াতী ইতিহাসের অন্যতম বড় মাইলফলক। হযরত জাফর বিন আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবিগণ যখন আবিসিনিয়ায় (হাবশা) হিজরত করেন, তখন রাজা নাজাশীর দরবারে হযরত জাফরের দেওয়া সুনিপুণ বক্তব্য ইসলামের সুমহান আদর্শকে আন্তর্জাতিক দরবারে প্রথম তুলে ধরে। পরবর্তীতে মক্কার সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে সাহাবিদের মদিনায় হিজরত করা মদিনাবাসীকে ইসলামের প্রতি আরও বেশি আকর্ষিত করেছিল।
নারী সাহাবিদের ভূমিকা
ইসলামের দাওয়াতি কাজে নারী সাহাবিদের (সাহাবিয়াত) অবদানও ছিল অতুলনীয়। হযরত খাদিজা (রা.) ইসলামের প্রথম দাওয়াত কবুল করে নিজের সমস্ত সম্পদ ও মানসিক সমর্থন দিয়ে মহানবী (সা.)-কে শক্তি জুগিয়েছিলেন। আবার হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)-এর মতো নারী সাহাবি তাঁর হবু স্বামী আবু তালহাকে ইসলাম গ্রহণের শর্তে বিয়ে করতে রাজি হয়ে এক অনন্য দাওয়াতি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতি মিশনের বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। মক্কার নির্যাতন কিংবা মদিনার রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা—কোনো কিছুই তাঁদের দাওয়াতি পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সাহাবিদের এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রম, কৌশলগত প্রজ্ঞা, অনুপম চরিত্র এবং অতুলনীয় ত্যাগের ফলেই আজ পৃথিবীর কোণে কোণে ইসলামের আলো পৌঁছে গেছে। ইসলামের ইতিহাসে তাঁদের এই অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
