Published on
:
5 min read
ঋষি ঘোষ
দুটো পাঁচশো টাকার নোট একটু বেশিই দোমড়ানো, আর একটা পাঁচশো টাকার হাল মোটের উপর ভালো। ময়লা একশো আর পঞ্চাশ মিলিয়ে আরও পাঁচশো। ভালো নোটগুলোকে নীচের দিকে চালান করে দোমড়ানো নোট দুটো এগিয়ে আনে একটি কর্কশ হাত। অপর হাতটি ধরে আছে একটি নরম শৈশব। তার অন্য হাত এক তরুণীর চঞ্চল হাতে আবদ্ধ, কোলে আর একজন। দূরে দাঁড়ানো একজন... তাড়াহুড়োর সিঁদুরে সামান্য মাখামাখি। পরিবারের চারজন নবমীতে মালদা টাউনে। বিচিত্রা বাজারের বহু-পরিচিত ‘নবমী পার্টি’! সাকুল্যে ওই দু’হাজারেই নতুন জামা, পারলে জুতো, সাধ ও শখের খাওয়া আর ঠাকুর দেখা। অনেক সময়ে ফেরার ভাড়াটাও থাকে না। শহরে ভিড়টা ওদের জন্যই উপচানো হয়।
মালদা টাউনের বিচিত্রা মার্কেট হোক বা চিত্তরঞ্জন মার্কেট, ঝলঝলিয়া রেলওয়ে বাজার হোক বা মঙ্গলবাড়ি রাজীব গান্ধী মার্কেট, শপিং মলের দৌরাত্ম্য শুরু হওয়ার আগে যে কোনও দোকানে বিক্রেতাদের একটা চেনা লব্জ ছিল এই রকম— ও সব কমা মাল আপনাকে দেখাতে যাব কেন? আপনি কি নবমী পার্টি না কি!
এই বাজারগুলোতেই নবমীর সকালে রতুয়া, মোথাবাড়ি, সামসি, হরিশ্চন্দ্রপুর বা মানিকচক থেকে বাসে করে পিলপিল করে শহরে নামে তারা। সারা রাত শহরের পথে পথে ঘুরে, কারও রোয়াকে বা বারান্দায় পা দুটোকে একটু বিশ্রাম দিয়ে দশমীর সকালে ফিরতি বাস বা ম্যাক্সি।
শহরে এসেই জামাকাপড়ের দোকানগুলোয় ঢুকে পড়ে ওরা। মালদা টাউনে অন্তত গোটা দশেক শপিং মল হলেও এখনও খুচরো দোকানের ব্যবসা টিকে আছে মূলত তাদের জন্যই। দেড়শো টাকার জামা, দুশোর প্যান্ট, চারশো টাকার সিল্কের(?) শাড়ি বা একশো কুড়ি টাকায় বাচ্চার জিনিস— এ সবের সম্ভার উপুড় করে দেওয়া তাদের সামনে। দোকানের অভিজ্ঞ সেলসম্যানেরা আগে থেকেই কায়দা করে জেনে নেন কতটা রেস্ত আছে পকেটে, সেই হিসেব অনুসারে মাল বার করেন তাঁরা। দোকানের সামনের নিচু টুলে বসে মাল বাছাবাছি করছে একটি পরিবার, পিছনে অপেক্ষমাণ একটি নতুন জুটি, এ দৃশ্য আকছার চোখে পড়ে। সময় নষ্ট করা যাবে না, পোশাকের কোয়ালিটি নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় তাদের কাছে নেই, কাপড়টা চকচকে আর নতুন হলেই হলো। ওরা দরাদরি খুব একটা করে না। পুরো কেনাকাটার ওপর ১০-২০ টাকা ছাড় পেয়ে গেলেই খুশি। কোনও ভাবে নবমীর দিনটা উপভোগ করার সময় যেন নষ্ট না হয়। কোনও পাবলিক টয়লেটে অথবা পিছনের দুটো দোকানের মাঝের অপরিসর ঘুপচিতে দ্রুততার সঙ্গে জামাকাপড় বদলে নতুন জামাকাপড়ের প্যাকেটে পুরোনোগুলো ভরে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়া। চারশো বিশ মোড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দু’টি শপিং মল। সেই শপিং মলের পাঁচ তলার ফায়ার এগজ়িট আর চাটাইয়ের দোকানের পিছনের দরজা— দুটো দিয়েই মহানন্দার প্রবাহকে একই রকম স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। তা একই রকম ধূসর, একই রকম ঘোলাটে, একই রকম মধুবিষে মাখামাখি। আর এটাই বৃহত্তর গৌড়বঙ্গের ‘লা দোলচে ভিতা’।
মালদার বিশিষ্ট চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট সৌমিত্র সরকার একটি আলোচনায় আম চাষ-নির্ভর মালদা জেলার বাজার অর্থনীতির পরিবর্তন এবং নগরায়ণের মধ্যে খুব চমৎকার একটি যোগসূত্র ধরিয়ে দিয়েছিলেন। যে হেতু ইংরেজ বাজার শহরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে শহরকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধের বৃত্তগুলি রচিত হয়, এবং নানা কারণে আম চাষের অর্থনীতি-নির্ভর গ্রামীণ মালদায় এই চাষ থেকে আগের মতো লাভ উঠে আসে না, তাই পুরোনো আমচাষিরা অনেকেই আগ্রহী চাষের বদলে সেই জমি প্লট করে বেচে দেওয়ার জন্য। আর পাঁচটা মফস্সলের মতো শহর উপকণ্ঠের জমির দর এখানে গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়ে। কেননা, মোটামুটি চার-পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বিন্যস্ত মালদা শহরের সম্প্রসারণের তেমন কোনও জায়গা নেই। ভাঙন-অধ্যুষিত রতুয়া, মোথাবাড়ি, কালিয়াচকের কিছুটা বা মানিকচক থেকে মানুষ যখন বাসস্থানের সন্ধানে শহরে আসেন, তখন তাঁরা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই শহরের জমির উপরে চাপ বাড়িয়ে ফেলেন। এক কথায় বলতে গেলে, কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নাগরিক সুবিধের টানে একটা বিপুল প্যারাডাইম শিফটের মধ্যে দিয়ে যায়— এটাকে এড়ানোর কোনও উপায় নেই। মালদার নদীভাঙন নিয়ে বছরখানেক আগের একটি গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছিল, দীর্ঘ কয়েক দশকের নদীভাঙনে জেলার মোট ভূমিভাগের শতাংশের হিসেবে বেশ খানিকটা চলে গেছে গঙ্গাগর্ভে। ফলে কৃষিযোগ্য ভূমির পরিমাণ প্রতি বছরই কিছুটা করে সঙ্কুচিত হচ্ছে, আর খুব সামান্য হলেও প্রতি বছর বদলে যাচ্ছে জেলার ভৌগোলিক মানচিত্রের চেহারা। এই নবমী পার্টিরা, অমিয়ভূষণ মজুমদারের উপন্যাসের সেই ‘ভালুক ভালুক চেহারার কালো মানুষেরা’, যারা বছর বছর মানিকচকের বানের পলিতে, গাজোলের তুমুল বর্ষার হাঁটুডোবা কাদায়, হরিশ্চন্দ্রপুরের মুখের তালু শুকিয়ে যাওয়া রোদে দাঁড়িয়ে শহরের ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স-ভোগী জনতার জোগান ঠিকঠাক রাখে— তারা এই অসম অর্থনৈতিক বিন্যাসের চিহ্ন হয়ে থেকে যায়, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের রক্তকরবীর ‘রাজার এঁটো’ হয়ে। ঝকঝকে পিতলের প্রদীপের নীচে কালিঝুলিমাখা পিলসুজ হয়ে।
বুলবুলচণ্ডীর গ্রামীণ অঞ্চল থেকে উঠে এসে পুরাতন মালদার গৌড় কলেজের অধ্যাপক নীলাদ্রিশেখর মৃধা কিছুটা পরিহাসের সুরেই বলেন— ‘শহরের মানুষদের যেমন ‘ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড’ গ্রামের পরিবেশ, পাখির ডাক, শান্ত প্রকৃতি ভালো লাগে, গ্রামে যারা থাকে তাদের কিন্তু সেটা কোনও মতেই ভালো লাগে না— বরং একঘেয়ে আর বিরক্তিকর লাগে। তাদের আবার শহরের জমজমাট ভিড়, দোকানের ঝলমলে আলো, রাস্তার গমগমে হাঁকডাক অনেক বেশি ভালো লাগে। আর ভালো লাগে বলেই তারা সেখানে বারবার যাওয়ার ছুতো খোঁজে।’
প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার ফাঁকে ডালপুরির দোকান আবিষ্কার করে নেওয়া। ছাঁকা তেলে ভাজা এই ডালপুরি মালদার প্রায় অলিখিত স্টেপল ব্রেকফাস্ট। কুড়ি টাকায় তিনটে পুরি আর ঝাল আলু-চানার তরকারিতে ঝোলের ভাগটা বেশি, সঙ্গে কুমড়োর লাল সস আর সাইট্রিক অ্যাসিডময় কাসুন্দি ইচ্ছেমতো। ফুড ভ্লগারদের লব্জে, ‘আনলিমিটেড তরকারি ফ্রি’। ওরা বারবার ঝোল আলু নিতে থাকে... ছ’টা ডালপুরি চারজনের পেটে মুহূর্তে চালান হওয়ার পরে তরুণী গিন্নি সন্তর্পণে বার করে মুড়ির প্লাস্টিকের পুঁটুলিটা। আবার ঝোল চায়। ডালপুরি ভাজার ফাঁকে আড়চোখে সে দিকে দেখে নেয় বিক্রেতা। অন্য দিনের মতো খেঁকিয়ে ওঠে না। আড়চোখে প্যাকেটটা এগিয়ে আনতে বলে। মুড়িতে ঢেলে দেওয়া অকৃপণ ঝোলে ছোলার সঙ্গে দু’-চারটে সয়াবিনও ছিল না?
এর পর কাজল সেনের কবিতার বইয়ের ভাষায়, ‘এই পিচরাস্তা শব্দের হারমোনিয়াম’। রথবাড়ি মোড় হয়ে, সিঙ্গাতলা ঘুরে, ২ ও ১ নম্বর গভর্নমেন্ট কলোনি হয়ে, বাঁধ রোড পেরিয়ে, নেতাজি মোড় থেকে সিধে চারশো বিশ মোড় হয়ে ঝলঝলিয়া স্টেশন রোড, নয়তো মহানন্দার দ্বিতীয় সেতু পেরিয়ে ওল্ড মালদা... পাঁচ-ছ’কিলোমিটার মালদা শহরকে পায়ে হেঁটে এক দিনে যতটুকু শুষে নেওয়া যায়, তার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-সহ এই দেখার উত্তেজনা দুপুরের খিদে ভুলিয়ে দেয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘যদু হাজরা ও শিখিধ্বজ’ গল্পে বৃদ্ধ অভিনতা যদু বলেছিল, সে রকম ভালো অভিনয়ের উত্তেজনা পুত্রশোক ভুলিয়ে দেয়— এ অনেকটা সেই রকমই।
সন্ধে ঢলতে থাকে রাতের দিকে। রথবাড়ি মোড়ে তিনতলা করিমস-এর বাইরে টেবিলের জন্য অপেক্ষারত সুবেশ-সুবেশাদের দিকে হাঁ করে তাকাতে তাকাতে সাড়ে তিনজনের পরিবার বসে পড়ে রাস্তার ধারের কোনও দাদা-বৌদি বা হাজি বিরিয়ানি সেন্টারে। ভিড় সেখানেও। যারা জায়গা পায় না, তারা পা ছড়িয়ে বসে অঞ্জলির সামনের চওড়া জায়গাটায়। আজ আর সিকিউরিটি তাড়া লাগাবে না— দোকান বন্ধ। দু’প্যাকেট বিরিয়ানি আর তিনটে জ্যালজ্যালে কাগজের প্লেট নিয়ে বাবা ফিরে আসে। মুখে বিজয়ীর হাসি। রাস্তায় প্লেট পেতে সে বিরিয়ানি ভাগ হয়। জাদুকরের টুপি থেকে খরগোশ বার করার কায়দায় বাবা হঠাৎ বার করে আনে একটা দশ টাকার ক্যাম্পা-র বোতল। ছেলে, বৌয়ের দিকে বোতলটা এগিয়ে দিতে তাদের চোখে যে আলো জ্বলে ওঠে, তাকেই বোধ হয় ‘মায়া’ বলে। উপরে সোডিয়াম ভেপারের আলো স্যুররিয়াল ছবির মতো সেই মায়ার উপর গলে গলে পড়তে থাকে। মনে হয়, এই শহরের কোনও শিল্পীও হয়তো ‘দ্য পোট্যাটো ইটার্স’ আঁকতে পারতেন! ছোট ছোট বৃত্তে এই খাওয়া চলতে থাকে। সামনে দিয়ে বয়ে চলা ব্র্যান্ডেড পাঞ্জাবি, জিনস আর কিটেন হিলসের স্রোতের দিকে তাকিয়ে সেই খাবারের স্বাদ অনেক বেড়ে যায়... সেই হাই সুগারের রোগীর মতো, স্বপ্নের রসগোল্লাতেও যিনি হুবহু কে সি দাশের স্বাদ আবিষ্কার করেন। সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে ত্রিনয়নের পিছনে জমে ওঠা পুজো আর নবমী পার্টিদের নিয়েই নবমী নিশি অবসানের পথে এগোয়।
রথবাড়ি মোড় আবার একটি মলিন, শুভ্র দশমীর ভোরের সাক্ষী হয়। হিমেল সকালে স্ট্যান্ডের লঝ্ঝড়ে ট্রেকারের ইঞ্জিন ইগনিশনের তারের খোঁচায় দু’-একবার কঁকিয়ে অবশেষে গর্জন করে ওঠে। ড্রাইভার সিট থেকে গলা বাড়িয়ে হেঁকে ওঠে— ‘লাও উঠো! সবটি মিলে দুইটা ভাড়া তো দিবা! শালা ফাস টিরিপে যত্ত নবমী পার্টি!’
