পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরের ঐতিহাসিক দুর্গামাতা মন্দির। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ রায় এখানে প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবিদার এই মন্দির এখনো জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।
এদিকে ইতিহাস বহনকারী মন্দিরটি আজও টিকে থাকলেও দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কারের অভাব, জমি নিয়ে জটিলতা এবং প্রবেশপথের সমস্যায় এর ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় লোকজন জানান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মন্দিরটিকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষিত স্থাপনার মর্যাদা দেওয়া, মন্দিরের জমি উদ্ধার, নিরাপদ ও স্থায়ী প্রবেশপথ নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক স্মৃতি। রাজা কংস নারায়ণ রায় রাজপণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর পরামর্শে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত সেই আয়োজনে ৯ লাখ ১ টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শরৎকালে দুর্গোৎসবের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
তাহেরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মী রতন কুমার সাহা বলেন, দুর্গামাতা মন্দিরটি আমাদের এলাকার গর্ব। এর সঙ্গে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাচীন ইতিহাস জড়িয়ে আছে। মন্দিরটির সংস্কার, জমি উদ্ধার ও সুন্দর প্রবেশপথের ব্যবস্থা করা হলে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষও এখানে আসবেন। আমরা চাই সরকারি উদ্যোগে মন্দিরটির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হোক।
মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত গোপাল চক্রবর্তী বলেন, প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, রাজা কংস নারায়ণ রায় রাজপণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর পরামর্শে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সেই উৎসবের স্মৃতি আজও তাহেরপুরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব।

মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক চিরঞ্জীব রায় বাবু বলেন, রাজবাড়ির পাশেই দুর্গামাতা মন্দিরটি গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা চললেও ১৯৬৭ সালে রাজবাড়িতে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর মন্দিরটি ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সাল থেকে সেখানে আবার পূজা শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে প্রায় ২৫ মণ ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা স্থাপন করা হয়। প্রতিমাটিতে নিয়মিত পূজা হয়। এটি বিসর্জন দেওয়া হয় না। ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এখানে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী আসতে পারেন।
মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে অন্যের জমির ওপর দিয়ে মন্দিরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। মন্দিরের প্রধান ফটক নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা রয়েছে। খাস খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের জন্য তিন একর জমি ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় দুই একর কলেজের সীমানার মধ্যে এবং বাকি এক একর স্থানীয়দের দখলে রয়েছে বলে মন্দির কমিটির অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সত্যজিৎ রায় তোতা বলেন, তাহেরপুরের দুর্গামাতা মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এর সঙ্গে বাংলার শারদীয় দুর্গোৎসবের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে। মন্দিরটির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ করা দরকার। সরকারি উদ্যোগে মন্দিরের জমি ও সীমানা নির্ধারণ করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
এদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানান, মন্দিরটি ঘিরে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, এলাকার মানুষের ঐতিহাসিক গর্বও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজার সময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। তবে যোগাযোগব্যবস্থা, প্রবেশপথ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তাহেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি আ ন ম সামসুর রহমান মিন্টু বলেন, ২০১৮ সালে মন্দিরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাজশাহী জেলার ব্যান্ডবুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে মন্দিরটির সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হওয়ার পাশাপাশি রাজশাহীর অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও ইতিহাস-সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, তাহেরপুরের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্যালারি, জাদুঘর বা দর্শনার্থী তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে রাজা কংস নারায়ণ রায়, তাহেরপুরের রাজবাড়ি, দুর্গামাতা মন্দির এবং বাংলায় শারদীয় দুর্গোৎসবের বিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব। এতে নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও তাহেরপুরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অমল চন্দ্র রায় বলেন, তাহেরপুরের দুর্গামাতা মন্দিরকে ঘিরে আমাদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও ঐতিহ্য রয়েছে। মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। জাতীয়ভাবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাহেরপুরে ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে। আমরা প্রশাসনের ইতিবাচক উদ্যোগের প্রত্যাশা করছি।
বিজ্ঞাপন
মন্দিরের বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, তাহেরপুরের দুর্গামাতা মন্দিরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় এর সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। মন্দিরটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি জমি ও প্রবেশপথসংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আমরা কাজ করব।
তিনি আরও বলেন, ঐতিহাসিক এ স্থাপনাকে ঘিরে পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এটিকে একটি আকর্ষণীয় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
এফএ/এএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
