বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর ভূরাজনীতিতে অন্যতম নিয়ামক ছিল খনিজ তেল বা কালো সোনা। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে বদলে গেছে এর সমীকরণ। ক্রমেই বাড়ছে পানিসংকট ও সুপেয় পানির চাহিদা। পানি বা পানিসম্পদ বলতে আমরা বুঝি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত অপরিহার্য একটি তরল উপাদান। তবে আন্তর্জাতিক দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, পানি শুধু তরল উপাদান নয়, বরং এটি আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে পানিসম্পদ এখন একাধিক রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের এই স্বার্থের টানাপোড়েনই পানিকে বা পানিসম্পদকে নিয়ে আসে রাজনীতির মঞ্চে, যা পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকস নামে পরিচিত। পানির রাজনীতি বলতে পানিসম্পদকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা স্বার্থ, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, বণ্টন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে বোঝায়। যখন কোনো নদী বা পানির উৎস একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন কে কতটুকু পানি পাবে, কীভাবে তা ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার প্রক্রিয়াই হচ্ছে পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকস শব্দটি ১৯৭৯ সালে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন ওয়াটারবারি। এরপর থেকেই পানিসম্পদকে ঘিরে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ ও বিরোধ নিয়ে আলোচনা আরো বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধ ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং এক ফোঁটা সুপেয় পানির অধিকারকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতে পারে। পানি যখন কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা শুধু পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে না, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করে।
বিজ্ঞাপন
পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকসের পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। তার মধ্যে উজান-ভাটির ভৌগোলিক অবস্থান, মিঠাপানির সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, কৃষি, শিল্পায়ন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ অন্যতম। পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকস আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। উজানের দেশগুলো যখন একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করে এবং পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ভাটির দেশগুলোতে পানির সংকট দেখা দেয়। শুধু পানির সংকট নয়, দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা। কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকাও সংকটের মুখে পড়ে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থাও কমে যায়।
বাস্তব উদাহরণ হিসেবে যদি আমরা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখা যায়, নদীগুলোকে ঘিরে পানির রাজনীতির বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। যেমনÑনীলনদের পানি বণ্টন ও ইথিওপিয়ার বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ইথিওপিয়া, মিসর ও সুদানের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। এতে তিন দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনীতিতে প্রভাব পড়েছে। একদিকে মিসর পানির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, অন্যদিকে ইথিওপিয়া বাঁধটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখছে।
একইভাবে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন ও ব্যবহার নিয়েও ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। সিন্ধু পানি চুক্তি দীর্ঘদিন কার্যকর থাকলেও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (কিষেনগঙ্গা ও রাটেল) নিয়ে পাকিস্তান আপত্তি জানিয়েছে। পাকিস্তান মনে করে, এসব প্রকল্পের কারণে পানির প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দুদেশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মেকং নদী। মেকং নদীর উজানে চীনের বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ভাটির দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পানিপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকসের প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশেও লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় পানির প্রবাহ কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর বাস্তব উদাহরণ হলো ফারাক্কা বাঁধ। ভারতে গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যায়। পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে কৃষিক্ষেত্রে কুপ্রভাব, নৌ-চলাচলে বাধা, মৎস্যসম্পদে প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়।
আমরা যদি আরো কিছু বাস্তব উদাহরণের কথা বলি, তাহলে আলোচনায় আসে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি। তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অমীমাংসিত পরিস্থিতি থাকায় এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকায়। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানির কারণে বন্যা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়।
পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিকস শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করছে। পানির সংকট, ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে যে বিরোধ চলছে, তা মোকাবিলা করার জন্য শুধু বাংলাদেশকে নয়, সম্মিলিতভাবে পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে সব দেশকে একই কাঠামোর আওতায় এনে পানির তথ্য ও নদীর প্রবাহসংক্রান্ত সব তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পানির সংকট, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশ ও ভারতের নদীগুলোর ন্যায্য পানি বণ্টনে কূটনৈতিক আলোচনা ও কার্যকর চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সব প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীভাঙন রোধ করতে হবে। ষষ্ঠত, বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং উত্তরাঞ্চলে আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। সপ্তমত, কম পানিনির্ভর ফসলের চাষ বাড়াতে হবে এবং পানি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলো কার্যকর করা অত্যন্ত প্রয়োজন। পানিকে কেন্দ্র করে এই মতবিরোধ ও প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পানিসংকট আরো তীব্র হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পানি শুধু সম্পদ নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি মাধ্যম। সেই সঙ্গে এটি সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতার বিষয়। তাই পানিকে কেন্দ্র করে সংঘাত নয়, ন্যায্য বণ্টনের মাধ্যমে শান্তি ও উন্নয়নের পথ সুগম করা জরুরি।
লেখক: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
ই-মেইল: afiyamobashiraoishi@gmail.com
