প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র প্লেস দে লা রিপাবলিকের কাছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক হাসান রোশদুলের একটি মোবাইলফোনের দোকান রয়েছে। গত শনিবার ওই এলাকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সহিংসতা ও লুটপাটের তাণ্ডব এসে পড়েছে তার প্রতিষ্ঠানেও। ভাঙা কাচের ফ্রেম আর ছড়ানো-ছিটানো চূর্ণ-বিচূর্ণ কাচ যেন সেই তাণ্ডবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে গিয়ে টানা ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রমে এই ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন রোশদুল।
দোকানের ভেতরটা এখন পুরোপুরি তছনছ। গ্লাসের কাউন্টারগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে, মেঝে ঢেকে আছে ভাঙা কাচে। যেসব ডিসপ্লে কেসে নতুন ও রিকন্ডিশনড ফোন, আইপ্যাড ও কম্পিউটার সাজানো ছিল, তার একটিও আর নেই। দেয়ালজুড়ে থাকা এক্সেসরিজের তাকগুলো এক রাতের মধ্যেই খালি হয়ে গেছে। রোশদুলের মতে, পরিস্থিতি
অত্যন্ত কঠিন। এমনিতেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য লাভ করা তো দূরের কথা, কেবল ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই প্রতিদিন চরম সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
এই সহিংসতায় রোশদুলের প্রায় ৭০ হাজার ইউরো বা প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের মালামাল চুরি হয়ে গেছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, তার বিমা নীতিতে চুরির ক্ষতিপূরণের সুযোগ না থাকায় তিনি বিমা কোম্পানি থেকে কোনো অর্থ পাবেন না। অবশ্য ফরাসি সরকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩ হাজার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের নতুন মালামাল তোলার জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে দুই শতাধিক তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে লুটপাটকারীরাও বেশ চতুর। মালামাল চুরি হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেগুলো অনলাইনে বিক্রি করতে শুরু করে তারা। ফরাসি মন্ত্রী আন লে হেনাফ আমাজন, ইবে, ভিলেটেড, মেটা ও টিকটকের মতো শীর্ষ প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে এসব চোরাই পণ্যের বিজ্ঞাপন অবিলম্বে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এই অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও রোশদুল এক চিলতে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। স্থানীয় গ্রাহক ও এলাকার বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের সাহায্য করতে সামাজিক মাধ্যমে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। প্রতিবেশীদের এই ভালোবাসা ও সহযোগিতা রোশদুলকে নতুন করে আশা জোগাচ্ছে।
রোশদুল নিজেকে একজন গর্বিত ফরাসি নাগরিক হিসেবে মনে করেন এবং মানুষের প্রতিবাদের অধিকারকে শ্রদ্ধা জানান। তবে সহিংসতার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। সামনেই আবার প্রতিবাদের ডাক থাকায় রোশদুল আশঙ্কা করছেন, আন্দোলনের নামে যদি আবার লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চলে, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।
