Published on
:
3 min read
কষা মাংস রোল, চিংড়ি টার্নওভার, সর্ষে চিকেন বার্গার, ভেটকি ভাজা স্যান্ডউইচ, ঢাকাই চিকেন র্যাপ, খাবারের নামগুলো শুনতে মন্দ লাগে না। খেতেও খারাপ নয়। কিন্তু তার সঙ্গে যখন আলুপোস্ত বার্গার যোগ করল এক আন্তর্জাতিক কফির চেন, তখনই গেল-গেল রব উঠল। বার্গারের উপরে ছড়ানো পোস্তর দানা। আর ভিতরে আলুপোস্তর পুর। এ রকম এক্সপেরিমেন্ট এর আগে কখনও হয়নি। খেতে ভালো না খারাপ, আলোচনাটা সেই পর্যন্ত গেলই না। অালুপোস্ত নিয়ে এ রকম এক্সপেরিমেন্ট বাঙালির ইমোশন নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের মতো হয়ে গেল। আর তাতেই ট্যুইট, পোস্ট, আর্টিকল-এ ছেয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়া। লাভবান হলো সেই কফি চেন। কারণ যাঁরা এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু জানতেন না তাঁরাও সামিল হলেন আলোচনায়। যাঁরা হয়তো কোনও দিন খেতেন না, নিছক কৌতূহলের বসে একবার খেয়ে দেখলেন। তাতে কি ব্যবসা বাড়ল? সেই হিসেব মেলেনি। তবে কে না জানে, নেগেটিভ পাবলিসিটিও এক ধরনের পাবলিসিটি। লোকের মুখে-মুখে খাবারের নামগুলো ফেরা, প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া কোনও ব্র্যান্ড-এর জন্য কম বড় প্রাপ্তি নয়।
উল্লেখ্য, পার্ক স্ট্রিটের শতাব্দীপ্রাচীন রেস্তোরাঁ ক্যাফেও এই পুজোতে তাদের নতুন মেনু লঞ্চ করেছিল। কী ছিল সেখানে? কাঁচকলার কোফতা প্যাটিস, সর্ষে ভেটকি পাতুরি পাফ, কলকাতা মাটন চপ, চিকেন-কড়াইশুটির এমপানাডা, পান তিরামিসু, মিষ্টি দই আর র্যাস্পবেরি ক্র্যাম্বল-সহ একাধিক পদ। কিন্তু তা নিয়ে তেমন চর্চা হয়নি। কলকাতার পুরোনো ক্যাফে হওয়ার পরেও তারা কিন্তু আলুপোস্তর মতো বাঙালি আবেগকে ধরতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে শহরের এক নামী ক্যাফের কর্ণধারকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি আলুপোস্ত বার্গার খেয়ে দেখেছি। ভালো লেগেছে। কিন্তু এই কথাটা বললেই সমস্যা। খাবার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হবেই। পুরোনো স্বাদ থাকবে। নতুন মেনুতে। না হলে চলবে কী করে? আমাদের শহরে তো মহুয়ার কুকিজ় বিক্রি হয়। ছানাপোড়া চিজ়কেক বিক্রি হয়। তাতে সমস্যা তো কিছু নেই। ইচ্ছে হলে খাবেন। ইচ্ছে না হলে খাবেন না। কেউ তো জোর করছেন না।’ অন্য এক নামী শেফ অবশ্য বলেন, আলুপোস্তর টেক্সচার একেবারেই বানের সঙ্গে যায় না। তাঁর বক্তব্য, ‘ফিউশন নিয়ে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু বেসিক গ্রামারটা ঘেঁটে দিলে হবে না। ফিউশনের নামে যা হোক করে দেওয়া যায় না। একটা ব্যালান্স থাকতে হবে। স্বাদ, উপকরণগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলতে হবে। অনেক মিশেলিন স্টার রেস্তোরাঁয় ফিউশন খাবার তৈরি করা হয়। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে একটা প্যারিটি থাকে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু তেমনটা হয়নি।’ ব্র্যান্ডিংটা কি উপযুক্ত হয়েছে? শহরের এক ব্র্যান্ড অ্যানালিস্ট বলেন, ‘এখন জলও ১০০০ টাকায় বিক্রি হয়, শুধুমাত্র ব্র্যান্ডিং-এর জোরে। দামি জল কিনে খাওয়া এখন স্টেটাস সিম্বল। এর জন্য অবশ্য সেলিব্রিটিদের ইনফ্লুয়েন্স রয়েছে। কাইলি জেনার ভিক্টোরিয়া সিক্রেটের ফ্যান্টাসি ব্রা লঞ্চ করলেন। যার দাম ৫০ মিলিয়ন ডলার। এই দাম বা হাইপ তো শুধু জিনিসটার নয়, ব্র্যান্ডিং-এর। পাঁচ মিনিট হাঁটার জন্য কাইলি নিয়েছেন ৫ মিলিয়ন ডলার। যা জিজি হাদিদ, বেলা হাদিদ, গিজ়েল বুন্দচেন্দের থেকে কয়েকগুণ বেশি। কেন এত টাকা তিনি পেয়েছেন? কারণ তাঁর পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং। এতগুলো কথা বলার কারণ একটাই, কখনও কখনও চর্চায় থাকাটাও দরকার। আর এই কফি চেন কিন্তু সেটাই করে দেখিয়েছে।’
এই ক্যাফে এখন প্রায় সব মল-এই রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার এক মল-এ দুই কলেজ পড়ুয়া খাচ্ছিলেন কষা মাংস রোল আর আলুপোস্ত বার্গার। একজন বললেন, ‘মা-এর হাতের আলুপোস্তর কোনও তুলনা নেই। তবে এটাও একবার খেতে খারাপ লাগছে না।’ অন্য জনের বক্তব্য, ‘আমি খাচ্ছি না আলুপোস্ত বার্গার। ভাত ছাড়া আলুপোস্ত আমি ভাবতে পারি না। বার্গারে আলুপোস্ত খেতে যাব কেন বলুন তো? তাও আবার কলকাতায় থেকে?’ বাকি খাবারগুলো তাঁর খারাপ লাগেনি, মেনে নিলেন।
আদতে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি বরাবরই ঐতিহ্য আর পরিবর্তনের সহাবস্থানের গল্প। একদিকে ঘরের রান্নার প্রতি গভীর টান, অন্য দিকে নতুন স্বাদ গ্রহণের আগ্রহ, এই দুই প্রবণতাই তাকে সমৃদ্ধ করেছে। হয়তো এই এক্সপেরিমেন্ট পছন্দ হয়নি খাদ্য রসিক বাঙালির। কিন্তু চর্চায়, পুজোর আড্ডায় জায়গা করে নিয়েছে আলুপোস্ত বার্গার। খাবার খারাপ না ভালো সে আলোচনা চলতে থাকবে। তবে অালুপোস্তর সঙ্গে বাঙালির আবেগকে জুড়ে এই চর্চায় টিকে থাকাটা বেশ অন্য রকম।
