The Sangbad · রাজনীতি
ভূরাজনীতি ও ভর্তুকির ফাঁদে বিশ্ব অর্থনীতি
১৮/১০/২০২৬

আইএমএফ সম্মেলনে বড় উদ্বেগে জ্বালানি খাতমূল্যস্ফীতি হলো দরিদ্রদের ওপর চাপানো এক ধরনের ট্যাক্স: আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাআমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই: আইএমএফসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল-জাদানভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকির ‘ভুল নীতি’ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ সংস্থার নীতিপ্রণেতারা বিশ্ব অর্থনীতি রক্ষায় অবিলম্বে জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব বাফার (সরকারের জমিয়ে রাখা অতিরিক্ত আর্থিক তহবিল) পুনর্গঠনের তাগিদ দিয়েছেন।সম্মেলনের মূল অধিবেশনে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে একটি দোদুল্যমান পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শক্তির টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তৈরি হওয়া নেতিবাচক জ্বালানি সরবরাহ ধাক্কা এবং অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থেকে আসা ইতিবাচক চাহিদার সম্ভাবনা।জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেন, এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই নীতিপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফাটল আরও বড় হওয়ার আগেই নিজেদের আর্থিক ঘরের জরুরি সংস্কার করুন।এদিকে সম্মেলনে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি নিয়ে সবচেয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে আইএমএফের ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ। বিভাগের প্রধান রদ্রিগো ভালদেস এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেন, জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া আর জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা এক কথা নয়। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী সংকটের মধ্যেও ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার কারণে ২০২৬ সালে দেশগুলোর জিডিপির প্রায় এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হতে পারে।আইএমএফ কর্মকর্তাদের যৌথ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং জ্বালানি বাফার (জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগাম মজুত) প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। জ্বালানি ও খাদ্যের মতো মৌলিক খাতের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর স্থায়ী চাপ তৈরি করছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে সংকট কাটাতে আইএমএফ সব দেশের সরকারকে সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি এবং কৃত্রিমভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পথ থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ এবং শুধুমাত্র নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক পদক্ষেপ বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।এক নজরে সম্মেলনব্যাংককের ঐতিহ্যবাহী কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) গত ১২ অক্টোবর শুরু হয় ‘আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ’ বার্ষিক সম্মেলন। ৭ দিনব্যাপী এই মেগা ইভেন্ট রোববার (১৮ অক্টোবর) শেষ হবে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অর্থনৈতিক হাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এই আয়োজনটি ফিরে এলো।সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বেসরকারি খাতের নির্বাহী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাত দিনে বিশ্ব অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচন, ভূরাজনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (অও) মতো উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সেশন ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।সম্মেলনের শুরুতে আইএমএফের পক্ষ থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক-ডব্লিউইও) এবং বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন (গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট) প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস নিয়ে প্রথম দুদিন (১৪-১৫ অক্টোবর) মুখর ছিল প্রেস ব্রিফিং কক্ষগুলো।সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বেসরকারি পুঁজি গঠন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দিয়ে বিশেষ ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ অক্টোবর ডেভেলপমেন্ট কমিটির মিনিস্টেরিয়াল লাঞ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই সাথে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে বিশেষ ব্রেকফাস্ট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।১৬ অক্টোবর সম্মেলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্টগুলোর একটি ছিল আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের বিশেষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা ‘ফায়ারসাইড চ্যাট’। এছাড়া এই দিনই বার্ষিক সম্মেলনের মূল প্লেনারি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির মূল ঝুঁকিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।সমাপনী বার্তাশনিবার (১৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) প্লেনারি অধিবেশন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী এই সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং আইএমএফসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল-জাদান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তারা বিশ্ব অর্থনীতি রক্ষায় ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও আর্থিক সংস্কারের চূড়ান্ত বার্তা দেন। সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিশ্বের সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি পছন্দ করে না। মূল্যস্ফীতি হলো দরিদ্রদের ওপর চাপানো এক ধরনের ট্যাক্স।”তিনি সতর্ক করেন, একদিকে এআই প্রযুক্তির কারণে প্রবৃদ্ধির আশা তৈরি হলেও অন্যপিঠে উচ্চ ঋণ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বড় হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।আইএমএফসি চেয়ারম্যান ও সৌদির অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখালেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই”।তিনি জানান, চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতগুলোর কারণে বৈশ্বিক নৌপথ ও বাণিজ্য রুট বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি সদস্য দেশগুলোকে অবিলম্বে ‘রাজস্ব বাফার’ বা নিজস্ব আর্থিক সঞ্চয় পুনর্গঠনের জোরালো তাগিদ দেন।রবিবার (১৮ অক্টোবর) প্রতিনিধি দলের আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৭ দিনের এই আয়োজন।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗