
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। কিন্তু এ সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি তরুণের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গা।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার প্লেনারি অধিবেশনে দেওয়া মূল বক্তব্যে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের এ চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক তথ্যে এ বিষয়ে জানানো হয়।
বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে অজয় বঙ্গা বলেন, কর্মসংস্থানের এ সংকট কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে ডিগ্রি নিয়েও চাকরি না পাওয়া হতাশ তরুণ-তরুণী এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিদ্যুতের অভাবে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত যুবসমাজ। বিপুলসংখ্যক তরুণের মেধা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো না গেলে এ সংকট জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বৈশ্বিক অর্থনীতি যেসব চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল, সেগুলোর অনেকই এখনো কাটেনি। বরং ভূরাজনৈতিক সংঘাত, উচ্চ ঋণের বোঝা, সীমিত সরকারি তহবিল এবং জ্বালানি ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক তাদের কার্যক্রমের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বড় পরিসরে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অজয় বঙ্গা।
নিজের বক্তব্যে গত তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অর্জনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে একটি প্রকল্প অনুমোদনে গড়ে ১৯ মাস লাগত, এখন তা কমে ৯ মাসে নেমেছে। এ ছাড়া জটিল মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তে ১৫৩টি সূচকের জায়গায় ২২টি প্রভাবকেন্দ্রিক সূচক চালু করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূলধন কাঠামো পুনর্গঠনের ফলে আগামী এক দশকে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের (আইবিআরডি) ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাড়বে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির তিনটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে উন্নত অবকাঠামো, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন বিশ্বব্যাংক প্রধান। তিনি জানান, গত এক বছরে বিশ্বব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে ১ হাজার ১২০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগৃহীত হয়েছে, যা তিন বছর আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি।
সংগৃহীত বেসরকারি পুঁজি ও নিজস্ব তহবিল মিলিয়ে গত বছর ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থায়ন করা হয়েছে বলে জানান অজয় বঙ্গা। এসব অর্থের বড় অংশ অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পর্যটনের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করা হয়েছে।
উন্নয়নশীল ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। অজয় বঙ্গা বলেন, উন্নত ও বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘বিগ এআই’ অনেক দেশের নাগালের বাইরে থাকলেও সাধারণ ব্যবহারভিত্তিক ‘স্মল এআই’ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শিক্ষকদের পাঠদান উন্নত করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।
জরুরি সেবা সম্প্রসারণের অগ্রগতি তুলে ধরে অজয় বঙ্গা জানান, ‘মিশন ৩০০’ উদ্যোগের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের নিরাপদ পানির সুবিধা নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ৪০ কোটি মানুষকে সেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি ২০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে কেবল জীবিকা নির্বাহের কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও বাজারমুখী কৃষিতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সংকটের মধ্যেও বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেছিলেন, একটি দেশের সমৃদ্ধি শুধু তার নিজস্ব সম্পদ নয়; বরং তা প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অতীতের সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাংক বর্তমানে সরকারি তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সংস্থা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে উন্নয়নের নতুন পথ তৈরি করছে। প্রতিটি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাংক প্রধানের বক্তব্যে উঠে এসেছে, আগামী দেড় দশকে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মজীবনে প্রবেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির প্রসার এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি।
অর্থসূচক/
The post বিশ্বজুড়ে ৮০ কোটি তরুণের কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা: বিশ্ব ব্যাংক appeared first on অর্থসূচক.
