সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে পৃথক অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের একটি গোপনীয় নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৮ অক্টোবরের ওই নথিটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। এতে বলা হয়, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
আলাদা অভিযোগে গ্রেপ্তার
কনস্যুলেটের হাতে আসা ৩০ সেপ্টেম্বরের বন্দিদের তালিকা অনুযায়ী, সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলাম আব্দুল বসিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার।
নথি অনুযায়ী, নজরুল জেদ্দার একটি সংশোধন কেন্দ্রে এবং সুইটি জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি ছিলেন। তারা দুজনই ‘আল মাজাল’ নামের একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
তবে বন্দিদের তালিকায় তাদের কারো বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না। ওই তালিকায় ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলেও নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে অপরাধের ঘরটি ফাঁকা ছিল।
মৃত্যুদণ্ডের কারণ নিয়ে প্রশ্ন
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার দায়ে নজরুল ও সুইটি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ অপরাধের কারণেই তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
তবে কনস্যুলেটের নথিতে তাদের গ্রেপ্তারের সময় উল্লেখ করা অভিযোগের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের কারণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ আইন বা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির তাদের জানা নেই।
বিচার ও আইনি সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
নজরুল ও সুইটির বিচার চলাকালে তাদের জন্য দোভাষী বা আইনজীবীর ব্যবস্থা ছিল কি না, সে বিষয়ে নথিতে কোনো তথ্য নেই। নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি আদালতে দোভাষীর সহায়তা দেওয়া হয়। তবে বিবাদীরা নিজেদের পছন্দমতো দোভাষী নির্বাচন করতে পারেন না।
এ ছাড়া, দুই বন্দির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন করা হয়নি বা যোগাযোগ করা হয়নি বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ডের তথ্য জানায়নি
নথি অনুযায়ী, নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড বা তা কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি।
এ ঘটনায় কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে। এতে আদালতের রায়ের অনুলিপি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, আদালতের রায় হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
সৌদিতে বন্দি ৩০৬ বাংলাদেশি
নথিতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে ৩০৬ জন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত।
এ ছাড়া সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলার তথ্যও নথিতে রয়েছে। এসব মামলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য এখনো কনস্যুলেটের হাতে না আসায় তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচার এবং দণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুদণ্ড ঘিরে সমালোচনা
এদিকে, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে এ বিষয়ে কোনো ধরনের অবহিত করা হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনা বিদেশিদের আইনি সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশি আইনজীবী খান খালেদ আদনান জানিয়েছেন, এই দুই কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে, সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিদের অধিকার— বিশেষ করে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ—কতটা নিশ্চিত করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র : ডেইলি স্টার
