হালকা কুয়াশার চাদর আর হিমেল হাওয়ার পরশে শীতের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে রাঙামাটির পাহাড় ও হ্রদ। নীল জলরাশিতে মেঘের ছায়া, সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ আর পড়ন্ত বিকেলে কাপ্তাই হ্রদে সূর্যাস্তের মায়াবী দৃশ্য— প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য টানছে ভ্রমণপিপাসুদের। শীতের আগমনে পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে বাড়ছে হোটেল-মোটেল ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা। অতিথিদের আগমনে পাহাড়জুড়ে ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য, নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
পার্বত্য গ্রামগুলোতে হেমন্তের শুরুতেই শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। এর সঙ্গে শরতের মেঘের রুপালি আভা আর নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলে তৈরি করে অপূর্ব এক নৈসর্গিক পরিবেশ। প্রকৃতির এই মায়াবী রূপে মুগ্ধ হন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা। রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু আর প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি শুভলং ঝরনা দেখতে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়ের প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাচ্ছেন অনেকে।
দেশের তিন পার্বত্য জেলার রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে সবুজ পাহাড়ের সঙ্গে কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মেলবন্ধন রাঙামাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। বছরের এই সময়ে হ্রদে পানির পর্যাপ্ততা ও নীল জলরাশির সৌন্দর্য পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ জোগায়। একই সঙ্গে জুমচাষে উৎপাদিত ফসল বাজারে উঠতে শুরু করায় পাহাড়ের গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে দর্শনার্থীদের। জেলার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতেও স্থানীয়রা জুমে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসছেন। পর্যটকরা এসব পণ্য কিনে পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিকাল গড়াতেই কাপ্তাই হ্রদে বাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা। স্পিডবোট ও ট্রলারে চড়ে পাহাড়ের গা-ঘেঁষে ঘুরে বেড়ান দর্শনার্থীরা। হ্রদের বুকে নৌযানের চলাচল, চারপাশের সবুজ পাহাড় আর দিগন্তে অস্তগামী সূর্যের রঙিন আভা মিলিয়ে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। প্রকৃতির এই অপরূপ আয়োজন উপভোগ করতে পর্যটকরা দীর্ঘ সময় কাটান হ্রদের বুকে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, শীতের শুরুতেই রাঙামাটিতে পর্যটকের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। শহরের হোটেল, মোটেল ও লেকভিউ রিসোর্টগুলোয় আগাম বুকিং চলছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোয় পর্যটকদের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ছে। পর্যটক ও অতিথিদের আগমনে শহরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় যেমন ব্যস্ততা বেড়েছে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ফিরছে গতি।
পর্যটকদের এই উপস্থিতিতে স্বস্তি ফিরেছে বোটচালক, ট্যুর গাইড, পাহাড়ি তাঁত ও হস্তশিল্পের পণ্য বিক্রেতা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে
এসব পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয়ও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় নজরদারি বাড়িয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এদিকে রাঙামাটি শহরের অন্যতম আকর্ষণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্মিত আরএইচডি লেকভিউ গার্ডেনেও প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। সেখান থেকে কাপ্তাই হ্রদ ও রাঙামাটি শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তারা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ইতোমধ্যে বাগানটিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া আট লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক পুলিশ বক্স। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সেখানে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, লেকভিউ গার্ডেনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ ঘুরতে আসেন। রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দিতে নেওয়া এই উদ্যোগ পর্যটকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় এক মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতু। গত সোমবার সকাল থেকে সেতুটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। সেতু খুলে দেওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
ঝুলন্ত সেতুর টিকিট কাউন্টারে দায়িত্বে থাকা মো. সোহেল জানান, সেতু খুলে দেওয়ার প্রথম দিন গত সোমবার পাঁচ শতাধিক টিকিট বিক্রি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেও পর্যটকদের উপস্থিতি বেশ সন্তোষজনক ছিল।
পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে যাওয়ায় গত ১১ সেপ্টেম্বর সেতুটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেদিন থেকেই সেতু পারাপার সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে হ্রদের পানি কমে এলে প্রায় এক মাস পর সেতুটি আবার খুলে দেওয়া হয়।
রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, সেতুটি এক মাস বন্ধ থাকায় পর্যটন করপোরেশনের প্রায় দেড় লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এটি আবার খুলে দেওয়ায় পর্যটন কার্যক্রমে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন তারা। তিনি আরও বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটি ঘিরে পর্যটকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আগামী ১৯ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন মোটেলের ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। পূজার ছুটিতে এবার পর্যটকদের ভালো সমাগম হবে বলে আশা করছেন তারা।
সব মিলিয়ে শীতের আগমনী বার্তা, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, সবুজ পাহাড় আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নতুন করে খুলে যাওয়া— সবকিছু মিলিয়ে রাঙামাটিতে পর্যটনের সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। পর্যটকদের এই আনাগোনা অব্যাহত থাকলে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
