চাকরিতে যোগদানের সময় বয়স প্রায় পাঁচ বছর কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে যমুনা অয়েল পিএলসি থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া কর্মচারী মাধব কুমার দাসের বিরুদ্ধে।
তিনি সর্বশেষ কোম্পানিটির খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে কর্মরত ছিলেন। অবসরে যাওয়ার আগে তাকে গত ১১ জুন তাকে দৌলতপুর ডিপো থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে বদলি করা হয়েছিল। ওই বদলি ঠেকাতে আবেদন করার পর তার বয়স জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হয়েছে।একপর্যায়ে ৬ সেপ্টেম্বর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ। যদিও বয়স জালিয়াতি করে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩ বছরের বেশি চাকরি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চাকরিতে যোগদান করেন মাধব কুমার দাশ। ওইসময় তার জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয় ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তার জন্ম ৩ জানুয়ারি ১৯৬৩। সে হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতেই তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এরপরও চাকরিতে ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনেও তার অবসরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগ। সম্প্রতি বদলির আদেশ স্থগিত চেয়ে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে আবেদন করার পর বিষয়টি সামনে আসে। পরে শারীরিক অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে তাকে চাকরি থেকে ডিসচার্জ করার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
৬ সেপ্টেম্বর কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরীর স্বাক্ষর করা আদেশ অনুযায়ী, গত ১৪ জুন বদলির আদেশ স্থগিত রাখার আবেদন করতে গিয়ে নিজের অসুস্থতার কথা জানান মাধব। ওই আবেদনে তিনি পরপর চারবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। বর্তমানে অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না বলেও জানান।
কোম্পানির আদেশে বলা হয়েছে, মাধবের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দৌলতপুর ডিপোর খণ্ডকালীন চিকিৎসা কর্মকর্তা ১৮ জুন প্রত্যয়ন দেন। এতে তাকে আংশিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এবং হাঁটাচলায় সম্পূর্ণ অক্ষম বলে উল্লেখ করা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতেও তিনি অক্ষম বলে প্রত্যয়নে জানানো হয়।
এরপর গত ২২ আগস্ট যমুনা অয়েলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা দৌলতপুর ডিপো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মাধব কুমার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চলাফেরা, ভারসাম্য রক্ষা, শারীরিক সমন্বয় এবং স্পষ্টভাবে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। ভবিষ্যতে আবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে তার। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় চিকিৎসার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাধব কুমারকে কোম্পানিতে কাজ করার জন্য শারীরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এরপর বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২২(১) ধারা উল্লেখ করে তাকে চাকরি থেকে ডিসচার্জ করার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। আদেশে সিদ্ধান্তটি ১৮ জুন থেকে কার্যকর দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে পত্র পাওয়ার পর যথাশীঘ্র সম্ভব চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে যমুনা ভবনে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে চূড়ান্ত পাওনাদি বুঝে নিতে তাকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে, অসুস্থতার বিষয়ে কোম্পানিতে দেওয়া চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রেও মাধবের বয়স ৬৫ বছর উল্লেখ রয়েছে। গত ২ এপ্রিল খুলনা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. পলাশ তরফদারের ব্যবস্থাপত্রে তার বয়স ৬৫ বছর লেখা হয়। একই বয়স উল্লেখ করা হয় ১১ মে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ্বজিৎ মন্ডল শোভনের ব্যবস্থাপত্রেও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি চাকরিতে বয়স প্রমাণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রকে যথাযথ দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এনআইডি জন্মতারিখ অনুযায়ী, মাধবের ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও কীভাবে তিনি চাকরিতে বহাল ছিলেন এবং তার অবসরের বিষয়ে এত দিন কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অব্যাহতি পাওয়া যমুনা অয়েলের কর্মচারী মাধব কুমার দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আইডি কার্ড অনুযায়ী বয়স আপডেট করা হয়নি। এটা ভুল ছিল এবং ঠিক করা হয়নি৷ এ কারণে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
দৌলতপুর ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার আবুল ফজল মো. সাদেকিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি আমি জয়েন করার আগের ঘটনা, এ কারণে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।
এমআর/আরএফ
