বগুড়ার ধুনট উপজেলায় জমির দলিল ও নামজারি ঘিরে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের পক্ষে পূর্ববর্তী বিক্রয় দলিল, খতিয়ান ও নামজারি-সংক্রান্ত নথি থাকার দাবি করেছেন অনুসন্ধানকারী সাংবাদিক। এসব নথির তথ্য অনুযায়ী, আগে বিক্রি করা জমিতে পুনরায় মালিকানা দেখিয়ে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি ৩৯৬ নম্বর একটি কবলা দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, দলিলে জীবিত এক নারীকে মৃত দেখানো, অন্যের ডিপি খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার এবং সরকারি রাস্তার জমি অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই দলিলের ভিত্তিতে নামজারি বা খারিজ করা হয়ে থাকলে, সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিক্রি করা জমিতে ফের মালিকানা!
অভিযোগ অনুযায়ী, ধুনট উপজেলার হোটিয়ারপাড়া গ্রামের মাহবুবুর রহমান আগে বিক্রি করা সম্পত্তিতে পুনরায় মালিকানা দেখিয়ে রুবেল হকের নামে দলিল সম্পাদন করেন। দলিলগ্রহীতা রুবেল হক একই গ্রামের বাসিন্দা। ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি নিবন্ধিত ৩৯৬ নম্বর কবলা দলিলটিকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত।
অভিযোগকারীর হাতে থাকা নথির বরাতে বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট জমির পূর্ববর্তী মালিকানা ও বিক্রয় দলিলের সঙ্গে নতুন দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখলে জমির স্বত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে অসংগতি পাওয়া যায়। একই সম্পত্তি আগে অন্যের কাছে বিক্রি হয়ে থাকলে, পরবর্তী দলিলে বিক্রেতার মালিকানা কীভাবে দেখানো হলো—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
জীবিত মাকে মৃত দেখানোর অভিযোগ
দলিলটিতে মাহবুবুর রহমানের মা মোছা. সাহেদা খাতুনকে মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, সাহেদা খাতুন জীবিত। একই দলিলে ২২২৫ ও ৫৪৭০ নম্বর ডিপি খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করে অন্যের জমি এবং সরকারি রাস্তার অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব তথ্য সঠিক হলে দলিলের বিবরণ, মালিকানার উৎস এবং জমির শ্রেণি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে সরকারি রাস্তার জমি ব্যক্তিগত বিক্রয় দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে, সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড ও সীমানা নির্ধারণ করে বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।
৩২ শতাংশ জমির হিসাব কোথায় মিলবে?
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০৪৭ নম্বর খতিয়ানে ৮, ১৮ ও ৬ শতাংশ—মোট ৩২ শতাংশ জমির হিসাব রয়েছে। তাঁর দাবি, এই জমি আগে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে এবং ক্রেতারাও নিজেদের নামে নামজারি সম্পন্ন করেছেন।
তাহলে একই জমির ওপর নতুন করে মালিকানা দাবি করে দলিল তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে নামজারি করার ভিত্তি কী ছিল? পূর্ববর্তী দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির সীমানা ও নামজারি মামলার নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
জাল দলিলের পর খারিজ—কীভাবে হলো?
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিতর্কিত দলিলের ভিত্তিতে জমি খারিজ বা নামজারি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তথ্য জানতে গেলে তহসিলদার আখতারুজ্জামানের কাছে তিনি ব্যাখ্যা চান।
অভিযোগকারীর দাবি, তহসিলদার জানান, সংশ্লিষ্ট ডিপি খতিয়ানে খারিজ বা খাজনার তথ্য না পাওয়ায় তিনি নামজারি করেছেন। এর জবাবে অভিযোগকারী বলেন, একই জমির অংশ পূর্বেই অন্য ব্যক্তিরা কিনে নামজারি করেছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে তথ্য না পাওয়ার ব্যাখ্যা এবং নামজারির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তহসিলদার আখতারুজ্জামান আরও বলেছেন বলে অভিযোগকারী জানান, নামজারিটি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ে, সাবেক ভূমি কর্মকর্তার সময়ে হয়েছিল। তবে ঠিক কোন কর্মকর্তা নামজারি অনুমোদন করেছেন, কী কী কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে এবং আদেশটি কোন নথির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বক্তব্য নিতে গিয়ে নতুন প্রশ্ন
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তহসিলদার আখতারুজ্জামানের কাছে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। এ সময় ফারুক নামের এক মোহরি ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। অভিযোগকারী তাঁকে দলিলের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি নিজে বিস্তারিত জানেন না বলে জানান এবং আলমগীর নামের আরেক মোহরির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে ফারুকের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে অভিযোগকারীর দাবি।
তবে কারও বক্তব্য দিতে অনীহা বা ফোন না ধরা কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না। তাই দলিল নিবন্ধনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও স্বাক্ষরের বিষয়গুলো মূল নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
দায় কার, তদন্তেই বেরিয়ে আসুক
একটি জমির মালিকানা নির্ধারণে পূর্ববর্তী দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি এবং নামজারি-সংক্রান্ত নথির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে বিক্রি করা জমিতে পুনরায় মালিকানা দেখানো, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত উল্লেখ করা কিংবা সরকারি রাস্তার জমি ব্যক্তিগত দলিলে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ সত্য হলে তা গুরুতর অনিয়মের বিষয়।
এ ঘটনায় ৩৯৬ নম্বর কবলা দলিলের নিবন্ধন-সংক্রান্ত নথি, পূর্ববর্তী বিক্রয় দলিল এবং নামজারি মামলার সম্পূর্ণ রেকর্ড পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি রাস্তার জমির সীমানা ও মালিকানা যাচাই এবং নামজারি অনুমোদনের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মূল প্রশ্ন এখন একটাই—পূর্ববর্তী মালিকানা ও বিক্রয় দলিলের তথ্য থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত দলিলটি কীভাবে নিবন্ধিত হলো এবং সেই দলিলের ভিত্তিতে নামজারি হয়ে থাকলে তা কীভাবে অনুমোদন পেল?
