চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্বর্তী বা পুনঃপরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। তবে চলতি বছরের এইচএসসি থেকেই পরীক্ষা নেওয়া শুরু হবে কি না, কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা হবে এবং কারা এ সুযোগ পাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শিক্ষা বোর্ডগুলোর মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি চূড়ান্ত করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা না করেই উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গতকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্বর্তী বা পুনঃপরীক্ষা চালুর বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়া সম্ভব বলে মত দেন। তবে পরীক্ষার নিয়ম, কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, কারা অংশ নিতে পারবে এবং কতবার এই সুযোগ দেওয়া হবে, সেসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানতে চেয়েছে, তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়া সম্ভব কি না। বোর্ড চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, এটি সম্ভব। তারা পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি আরো জানান, আগামী ২৫ থেকে ২৯ নভেম্বরের মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ফল প্রকাশের পর চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা থেকেই নতুন এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হতে পারে। তবে বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এক বছরের অপেক্ষা কমানোর উদ্যোগ : বর্তমান ব্যবস্থায় এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হলে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে এইচএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো ব্যাপক। একটি বা দুটি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা এবং কর্মজীবনে প্রবেশের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়।
প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী পরীক্ষা চালু হলে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য সেই অপেক্ষার সময় কমে আসতে পারে। ফল প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার আয়োজন করা গেলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাবে। এতে তাদের শিক্ষাজীবনের এক বছর নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। তবে এ সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পরীক্ষার কাঠামো ও নীতিমালার ওপর। অনুত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে, নাকি নির্দিষ্টসংখ্যক বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য এ সুযোগ সীমিত থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একইসঙ্গে পুনঃপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা, সিদ্ধান্ত হয়নি : শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সোমবারের সভায় পুনঃপরীক্ষার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে কতজন শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে, কতটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেসব বিষয় উঠে আসে। আলোচনার একপর্যায়ে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে প্রথমে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার প্রসঙ্গ আসে। পরে অন্যান্য বিষয়েও পরীক্ষা আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কোন বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, বোর্ড চেয়ারম্যানরা পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পরীক্ষার বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার ধরন, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশের সময়সীমা বিবেচনায় নিতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন করতে হলে বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এইচএসসি দিয়ে শুরু, এসএসসিতে আপাতত নয় : প্রাথমিকভাবে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পুনঃপরীক্ষা চালুর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে চলতি বছরে কলেজে ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় এবার এসএসসি থেকে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। এ কারণে এইচএসসিতে প্রথমে ব্যবস্থা চালু করে এর কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এসএসসি ও এইচএসসির শিক্ষাক্রম, পরীক্ষার ধরন এবং পরবর্তী শিক্ষাস্তরে ভর্তির প্রক্রিয়া এক নয়। ফলে দুই পরীক্ষার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর করা হবে, নাকি আলাদা নীতিমালা তৈরি করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ঘোষণার পর উদ্যোগ : গত ১০ অক্টোবর রাজধানীতে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান। এরপর বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকেই পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের সম্ভাব্যতা নিয়ে বোর্ড চেয়ারম্যানদের মতামত নেওয়া হয়। তাদের ইতিবাচক অবস্থানের ফলে চলতি বছরের এইচএসসি থেকেই ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের অপেক্ষা।
বাস্তবায়নে প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা : শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার সুযোগ তৈরি হলে তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার সুফল নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রথমত, কোন ধরনের শিক্ষার্থী পুনঃপরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ কতটি বিষয়ে পুনঃপরীক্ষা দিতে পারবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নিবন্ধন, ফরম পূরণ, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়েও নির্দেশনা প্রয়োজন। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও মান বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়মিত পরীক্ষার মতোই প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা, সুষ্ঠু পরীক্ষা গ্রহণ, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ যেন নিয়মিত পরীক্ষার প্রস্তুতির বিকল্প হিসেবে বিবেচিত না হয়, সে বিষয়েও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
ফলে এইচএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্বর্তী পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে একটি বা কয়েকটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যায়, তাদের জন্য এটি হতে পারে সময় ও সুযোগ বাঁচানোর কার্যকর পথ। তবে উদ্যোগটি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবসম্মত সময়সূচি, স্বচ্ছ নিয়ম এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারলেই শিক্ষার্থীরা এর প্রকৃত সুফল পাবে।
বিআলো/অর্নব