মানুষ সামাজিক জীব। পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ওপরই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ সমাজ। কিন্তু যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি প্রচারিত হয়, যুক্তির পরিবর্তে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং অন্যের সম্মান নষ্ট করাকে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
বিশ্বজুড়ে অপপ্রচার, গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহননের প্রবণতা তাই আজ গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা শান্তিপূর্ণ পৃথিবী নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
মতপার্থক্য মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রের কাজের সমালোচনাও একটি সুস্থ সমাজের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমালোচনা ও চরিত্রহনন এক বিষয় নয়। সমালোচনা সত্য, যুক্তি ও প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়; চরিত্রহননের উদ্দেশ্য প্রায়ই কাউকে হেয় করা, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা কিংবা তাঁকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। কোনো ব্যক্তির কাজের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করা যায়, এমনকি তাঁর ভুলের জন্য জবাবদিহিও দাবি করা যায়। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগ, বিকৃত তথ্য কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে তাঁকে অপমান করার অধিকার কারও নেই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাও সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে এই সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অসত্য বক্তব্য, সম্পাদিত ছবি কিংবা প্রেক্ষাপটবিচ্ছিন্ন ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অনেক সময় তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই মানুষ তা শেয়ার করে, মন্তব্য করে কিংবা অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরে তথ্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও প্রথম প্রচারের ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না। মানুষের সম্মান, পারিবারিক সম্পর্ক, পেশাগত জীবন ও মানসিক শান্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মনে রাখা জরুরি, কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা শুধু বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে ব্যক্তিগত সচেতনতা। কোনো খবর বা অভিযোগ দেখামাত্র তা বিশ্বাস করা কিংবা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে কয়েকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন: তথ্যটির মূল উৎস কী? নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর সমর্থন আছে কি? বক্তব্য বা ছবিটি কি তার প্রকৃত প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য জানার সুযোগ হয়েছে কি? সন্দেহ থাকলে প্রচার বন্ধ রাখাই দায়িত্বশীল আচরণ। কারণ, একটি মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, কিন্তু তার ক্ষতি সংশোধন করতে কখনো কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়।
তবে ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ। পরিবারে শিশুদের সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্য যাচাই, যুক্তিবোধ এবং ডিজিটাল নাগরিকত্বের চর্চা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমকে সংবাদ প্রকাশে যথাযথ যাচাই ও পেশাগত নৈতিকতা অনুসরণ করতে হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অপপ্রচারবিরোধী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও মনে রাখতে হবে, শেয়ার করা প্রতিটি বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব রয়েছে। জনপ্রিয়তা অর্জন, প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা কিংবা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করার জন্য অসত্য প্রচার কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অপপ্রচারের শিকার ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানোও এই প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সময় অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই মানুষ ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে, তাঁকে সামাজিকভাবে একঘরে করে দেয় কিংবা নীরব থেকে অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে। অথচ ন্যায়বোধ দাবি করে, অভিযোগের ভিত্তি যাচাই করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ দিতে হবে এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। কোনো অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পাল্টা গুজব, অপমান কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের আশ্রয় নেওয়াও উচিত নয়। তাতে অন্যায়ের প্রতিরোধ হয় না; বরং একই অন্যায়ের আরেকটি চক্র তৈরি হয়।
প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা বা মানহানিকর বিষয়বস্তুর অভিযোগ জানানো, প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রতিকার গ্রহণ করা উচিত। তবে প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে শান্তিপূর্ণ, প্রমাণনির্ভর ও ন্যায়সংগত। সামাজিক প্রতিরোধের অর্থ কাউকে জনতার বিচারে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, ক্ষতি কমানো, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
এখানে ইতিবাচক পরচর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যের অনুপস্থিতিতে তাঁর নিন্দা করার পরিবর্তে ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া, সাফল্য থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সমস্যায় পড়লে সহযোগিতার উপায় খোঁজা সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ায়। যে সমাজে মানুষের ভালো কাজের প্রশংসা করা হয়, সেখানে ইতিবাচক কাজের অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ে। যে সমাজে মিথ্যা, বিদ্বেষ ও অপমানের পরিবর্তে সত্য, গুণকীর্তন ও গঠনমূলক সমালোচনাকে উৎসাহিত করা হয়, সেখানে সামাজিক আস্থা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানোর চেয়ে তার ভালো গুণকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভুল থাকলে ন্যায্যভাবে তা সংশোধনের চেষ্টা করা অনেক বেশি কল্যাণকর।
অপপ্রচার ও চরিত্রহননের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কোনো ব্যক্তি, দল, প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি দেশের একক বিষয় নয়। এটি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার বৈশ্বিক দায়িত্ব। এই প্রতিরোধের জন্য প্রত্যেককে নিজের আচরণ দিয়ে শুরু করতে হবে। কোনো অসত্য তথ্য ছড়ানো হবে না, যাচাইহীন অভিযোগে কাউকে অপমান করা হবে না, অন্যায়ের শিকার মানুষকে একা ফেলে রাখা হবে না এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বিদ্বেষের আশ্রয় নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আইন, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতিতে গড়ে ওঠে না; এর জন্য মানুষের মনে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও সহমর্মিতাও প্রতিষ্ঠা করতে হয়। অপপ্রচার সেই বিশ্বাসকে ধ্বংস করে, আর সত্যনিষ্ঠ আচরণ তাকে পুনর্গঠনের পথ দেখায়। তাই সামাজিক নীরবতা নয়, প্রয়োজন বিবেকের জাগরণ; প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়সংগত প্রতিরোধ; পরনিন্দা নয়, প্রয়োজন গঠনমূলক আলোচনা।
আজ সময় এসেছে একটি সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকারের: তথ্য যাচাই না করে প্রচার নয়, প্রমাণ ছাড়া অপবাদ নয়, মতপার্থক্যের কারণে চরিত্রহনন নয়। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপপ্রচারের বিস্তার রোধ করা হোক প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, মানবিক মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়েই সামাজিক শান্তি শক্তিশালী হয়, আর সামাজিক শান্তির পথ ধরেই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী।
লেখক: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট
