দীর্ঘদিনের আপেক্ষিক অচলাবস্থা ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো নজিরবিহীন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকাঠামোকে নতুন করে এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। গত শনিবারের এই বিধ্বংসী হামলায় ১২ জনের প্রাণহানি— যার মধ্যে দুজন বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকও রয়েছেন এবং তিন শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাধারণ ও বেসামরিক মানুষই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বলি হচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের আকাশপথের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে দাবি করা হুতিদের এই পদক্ষেপ কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আকাশসীমা এড়িয়ে চলার জন্য বিমান সংস্থাগুলোকে হুতিদের হুঁশিয়ারি এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত বাণিজ্যিক রুট স্তব্ধ করে দেওয়ার হুমকি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবাহিত হয়; ফলে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব বাণিজ্যে জাহাজ চলাচলের ব্যয় ও সময় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক বিমানবন্দর ও যাত্রীবাহী টার্মিনালে হামলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও গর্হিত অপরাধ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এরই মধ্যে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে উত্তেজনার পারদ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার তীব্র সমালোচনা করে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় প্রত্যক্ষ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই সক্রিয় অবস্থান এবং পাল্টা ব্যবস্থার ইঙ্গিত অঞ্চলটিকে একটি সীমিত, ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ থেকে সরাসরি বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক মহা সংঘাতে রূপান্তরিত করার চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই আঞ্চলিক অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারে সৌদি আরব অন্যতম প্রধান সংযোগকারী। হুতিদের এই ধরনের ধারাবাহিক হামলা তেলের উৎপাদন ও অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলায় অপরিশোধিত তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। মহামারির ধাক্কা ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির পর এরই মধ্যে চাপের মুখে থাকা বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে; বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রবাসীদের নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, যাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা এবং তাদের পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
যুদ্ধ বা সামরিক আগ্রাসন কখনো কোনো স্থায়ী শান্তি বা টেকসই সমাধান আনতে পারে না; বরং তা সংকটকে দীর্ঘায়িত করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নিরবচ্ছিন্ন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। বর্তমান এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক পরাশক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে— জাতিসংঘ, আরব লিগ ও বিশ্বনেতাদের মধ্যস্থতায় দ্রুত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং হুতি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসকে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণকক্ষ খুলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশসহ আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি উৎস ও কৌশলগত মজুত বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া।
রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের কোনো বিজয়ী নেই, এখানে পরাজিত কেবল মানবিকতা। আমরা আশা করি, বিশ্বনেতারা নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অবিলম্বে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবেন, যাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে শান্তির সুবাতাস ফিরে আসে এবং আর কোনো নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে না পড়ে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ
