ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে মসজিদের মাইক ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে আগে থেকেই থাকা মসজিদের লাউডস্পিকারগুলোকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা যাচাই করছেন বিজ্ঞানীরা। এ লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চলছে, যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকার কথা।
প্রকল্পটির উদ্যোক্তা জাপানের দুর্যোগবিষয়ক বিজ্ঞানী ইনোয়ে হিরোশি। তিনি জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ প্রতিরোধ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত এবং ইন্দোনেশিয়া সরকারের সহযোগিতায় কাজ করছেন। দেশটিতে জাপানের মতো ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব কি না, তা যাচাই করাই তাদের লক্ষ্য।
বিজ্ঞাপন
ইনোয়ে বলেন, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিটি জনপদেই প্রায় মসজিদ রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মাইককে সতর্কবার্তা প্রচারের কাজে ব্যবহার করা গেলে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছেও দ্রুত খবর পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
প্রায় দুই দশক আগে সুমাত্রায় ভয়াবহ ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণার সময় তার মাথায় এ ধারণা আসে। ২০০৯ সালে পশ্চিম সুমাত্রায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ইনোয়ে বলেন, ভূমিকম্পের কম্পন পৌঁছানোর আগেই মানুষ সতর্কবার্তা পেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
মোবাইল নেটওয়ার্কের বিকল্প হতে পারে মসজিদের মাইক
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় লাখ লাখ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবার আজান দেওয়া হয় এবং মাইকের ব্যবস্থা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকদের মতে, দুর্যোগের সময় সতর্কবার্তা পৌঁছানোর জন্য একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সেটি সচল রাখাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে মসজিদের মাইক বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। কারণ, এগুলো আগে থেকেই স্থাপিত এবং স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
বর্তমানে অনেক দেশে দুর্যোগের সতর্কবার্তা পৌঁছাতে মোবাইল ফোননির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। তবে ভূমিকম্পে যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মোবাইল নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। ফলে বিকল্প হিসেবে মসজিদের মাইক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মসজিদকে ভূমিকম্প শনাক্তকারী সেন্সর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এখনো এই ব্যবস্থা থেকে সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে না।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং যৌথ গবেষক দলের দেশীয় প্রধান আন্ডি একা সাকিয়া বলেন, প্রকল্পটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, ভূমিকম্পের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে মানুষকে যত দ্রুত সম্ভব সতর্ক করা, যাতে তাঁরা দ্রুত নিরাপদ পদক্ষেপ নিতে পারেন।
তার মতে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের কোনো গ্রামের বাসিন্দারা সতর্ক হওয়ার জন্য মাত্র পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় পেতে পারেন। কারণ, ভূমিকম্পের তরঙ্গ মাটির ভেতর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্দোনেশিয়ায় ২০০৮ সাল থেকে সুনামির আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে মসজিদের মাইকনির্ভর এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
জাপানের মতো নয়, ভিন্ন হতে পারে নিরাপদে বাঁচার কৌশল
ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়, তা নিয়েও গবেষণা করছেন জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার বিজ্ঞানীরা। দুই দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে উভয় দেশেই প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
জাপানে ভূমিকম্পের সময় সাধারণত মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং মাথা ও শরীর সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার অনেক এলাকায় ভবন নির্মাণে এমন উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যা ভূমিকম্পে সহজেই ধসে পড়তে পারে। বিশেষ করে অপর্যাপ্তভাবে শক্তিশালী করা ইটের দেয়াল ও ভবন বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসা মানুষের জন্য বেশি নিরাপদ হতে পারে। ইনোয়ের মতে, ইন্দোনেশিয়ার মানুষ ভূমিকম্পের সময় দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা দেখান। তবে কোন পরিস্থিতিতে কোন কৌশল সবচেয়ে নিরাপদ, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে গবেষকেরা বিভিন্ন পরিস্থিতির অনুকরণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মানুষের আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো, দেশটির ভবন নির্মাণের ধরন ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে কার্যকর নির্দেশনা তৈরি করা।
অন্য দেশেও দুর্যোগের সতর্কবার্তায় মসজিদের মাইক
শুধু ইন্দোনেশিয়া নয়, মুসলিম-অধ্যুষিত আরো কয়েকটি দেশেও দুর্যোগের সতর্কবার্তা প্রচারে মসজিদের লাউডস্পিকার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনার সময় সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দেওয়ার বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মসজিদের মাইক ব্যবহার করা হতে পারে।
এদিকে উজবেকিস্তানে আরো বড় পরিসরে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশটির জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় চলতি বছর ২৭২টি মসজিদে সতর্কবার্তা দেওয়ার যন্ত্র স্থাপনের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ঘোষণা করেছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে বন্যা, কাদামাটির স্রোত, ভূমিধস ও তুষারধসের বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলেছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে এবং মানুষ যেসব প্রতিষ্ঠানকে আস্থার জায়গা হিসেবে দেখে, সেগুলোকে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দোনেশিয়ার প্রকল্পটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলার কথা। মসজিদের পাশাপাশি স্কুলের লাউডস্পিকার, রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমেও কীভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছানো যায়, তা খতিয়ে দেখছেন গবেষকেরা।
প্রকল্পটি সফল হলে আগে থেকে থাকা অবকাঠামো ব্যবহার করেই দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পৌঁছানোর নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবস্থা চালু করার আগে এর কার্যকারিতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
