সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শিমুল তালুকদার। শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, নিজেই ঝাড়ু হাতে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান পরিষ্কার করেছেন। কখনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ দেখিয়ে দেন, আবার কখনো প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে পরিষ্কার করেন দেওয়াল ও টয়লেটের বেসিন।
প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও বিকেলে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি। সকালে তার নেতৃত্বে একটি দল হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগ ঘুরে দেখে। কোথাও ময়লা-আবর্জনা বা অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ডেকে বুঝিয়ে দেন। প্রয়োজনে নিজেই কাজ শুরু করে দেখিয়ে দেন কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
তার এমন উদ্যোগে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। আরএমওর নিয়মিত তদারকি ও আন্তরিক আচরণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও কাজের প্রতি আরও মনোযোগী হয়েছেন। কেউ কাজে গাফিলতি করলে তাকে ডেকে বুঝিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। ফলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও কমেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রয়োজন ৪২ জন। তবে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ১৭ জন। প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী কম থাকায় দায়িত্ব পালনরতদের ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের উৎসাহ দিয়ে এবং সবাইকে নিয়ে দলগতভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন আরএমও।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা পোস্ট। তারা জানান, আগে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধ থাকলেও এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আগের তুলনায় হাসপাতাল পরিষ্কার থাকায় তারা স্বস্তি পাচ্ছেন।
হাতের সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসা মো. গোলাম, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আসা সেলিম সরকার ও ছেলের চিকিৎসার জন্য আসা মোছা. বৃষ্টি বলেন, ‘এই হাসপাতালে আগে খুব দুর্গন্ধ ছিল। তবে এখন সেই দুর্গন্ধ নেই। আবার হাসপাতাল আগের চেয়ে তুলনামূলক পরিষ্কার। যদি এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, তবে আমরা উপকার পাবো। আবার অতি সহজে ডাক্তার দেখাতে পারলাম। এটি অব্যাহত থাকুক।’
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে কাজ করা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও বলছেন, নিয়মিত তদারকি ও উৎসাহ দেওয়ার কারণে তাদের কাজের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী পারুল রানী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি ২৬ বছর ধরে এখানে কর্মরত আছি। বর্তমানে আমাদের পেছনে আরএমও স্যার সবসময় লেগে থাকেন। তিনি তিনবেলা এসে পরিদর্শন করেন। তার ব্যবহার ও মুখের ভাষা এতটা সুন্দর যে, আমরা স্বেচ্ছায় কাজ করি। তিনি যত কঠিন কাজ করতে বলেন, আমরা পারব।’

আরেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয়রাম বাসফর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা যখন ঝাড়ু দিই, মাঝে মাঝে স্যার এসে দেখেন। এমন হয়, ঝাড়ু ঠিক মতো দেওয়া না হলে, তিনি নিজেই ঝাড়ু নিয়ে পরিষ্কার করা শুরু করেন।’
হাসপাতালের সহকারী ওয়ার্ড মাস্টার মো. সেলিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। তবে গত ৩ মাস ধরে আরএমও স্যারের নির্দেশনায় আমরা একটি টিম ওয়ার্ক করে কাজ করছি। এই কাজটি প্রতিদিন করা হচ্ছে। আগের চেয়ে হাসপাতাল অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শিমুল তালুকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমার লক্ষ্য শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা নয়, রোগীদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট থাকায় যারা কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ রয়েছে। তাই তাদের সঙ্গে নিয়ে দলগতভাবে কাজ করছি। আমি নিজে কাজ করলে তারাও উৎসাহ পান। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।’
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হাসপাতাল সবার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা প্রয়োজন। আমাদের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শিমুলকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসবের বাইরেও তিনি পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য টিম বানিয়ে কাজ করছেন। আবার তিনি নিয়মিত রোগীও দেখছেন। এই হাসপাতালে পরিচ্ছন্নকর্মী ও ডাক্তারের সংকট রয়েছে। তিনি দুটো কাজেই সহযোগিতা করছেন। আমার জানা মতে, দেশে হয়ত এমন মেডিকেল অফিসার কোনো হাসপাতালেই নেই।’
মো. নাজমুল হাসান/এএমকে
