কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা; নদীমাতৃক সভ্যতায় গড়ে উঠা প্রায় পৌনে দুইশ বছরের প্রাচীন পৌর শহরকে আগলে রেখেছিল বিশুদ্ধ পানি ও বাতাসের বাতায়নে। বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে এক প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে আসছিল এক সময়ের প্রমত্তা নরসুন্দা। এখন সেই নরসুন্দার বিষাক্ত বায়ু ছড়িয়ে পড়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি করেছে প্রায় দুই লাখ মানবপ্রাণে। এক দশকের পচা-মজা কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা, দখল-দূষণে বিপর্যস্ত জনজীবনে নেই কোনো স্বস্তির বার্তা। এখন আর কেউ এগিয়ে আসতে রাজি নন পুরনো ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদ নরসুন্দার রূপ লাবণ্য যৌবন ফিরিয়ে দিতে । ফলে একেবারে অন্যরকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে প্রাচীন এই পৌর শহর ঘিরে।
কিশোরগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রমত্তা নরসুন্দা এখন ময়লার ভাগাড়। প্রায় এক দশক ধরে নরসুন্দার বুকে জমে আছে কচুরিপানার স্তূপ। তার ওপর রাতের অন্ধকারে নদী তীরবর্তী কিছু মানুষ বাসাবাড়ি কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁর ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিস্থিতি এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, এটাকে এখন নদী বললে নতুন প্রজন্ম বিশ্বাসই করতে চায় না! নরসুন্দা এখন একদিকে যেমন মশা উৎপাদন খামারে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনা থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে শহুরে জীবনই বিষাক্ত করে তুলছে; মানুষ ভুগছে চর্ম, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল ও কঠিন রোগে।
৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নরসুন্দার শহরের অংশটুকু পরিষ্কার করতে অন্তত সাত দফা পৌরসভা, সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাজনৈতিক দলেরও ঘটা করে উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যত ফটোসেশনেই সীমাবদ্ধ ছিল। একেকটি উদ্যোগের পেছনে পৌর প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পরিবেশবাদী সংগঠন, আলেম-উলামা মাশায়েখদের সংগঠন, সর্বশেষ জেলা পরিষদ।
২০১৩ সালে তৎকালীন এলজিআরডিমন্ত্রী মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বদান্যতায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নরসুন্দা নদী খনন, নদীর দু’পাশে পাঁচ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজসংলগ্ন নদীতীরে লেকসিটি নির্মাণ, নদীতীরে দুটি পার্ক নির্মাণ, সোলার প্যানেলসহ ওয়াকওয়েতে আলোর ব্যবস্থা, বনায়ন, নতুন ব্রিজ নির্মাণ ও পুরনো ব্রিজ সংস্কার, ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ কাজের মধ্যে দিয়ে একটি আধুনিক শহরের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলেও লুটপাটেরও অভিযোগ রয়েছে এবং কাজের তুলনায় অর্থ লুটপাটের ঘটনাই বেশি ঘটেছে।? ওই সময়ে আমাদের সময়সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের দফায় দফায় মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করায় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. রইছ উদ্দিনের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি নরসুন্দা খনন ও সংস্কার এবং লেকসিটি নির্মাণ প্রকল্পের কাজের দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে গেলেও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি আজও। এসব বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, পৌর নাগরিক হিসেবে আমিও এর ভুক্তভোগী। যদিও শহরাংশে নরসুন্দার দখল-দূষণ, কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার পৌরসভার কাজ, তদুপরি আমি প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছি- কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে নরসুন্দাকে পুনঃখননের মাধ্যমে দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে তার নাব্য ফিরিয়ে দেওয়া যায়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই কাজ করতে চাই।
এমপি মাজহারুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা পৌরবাসীই আজকের অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরাই ময়লা-আবর্জনা ফেলে, দখল-দূষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছি। দেখে মনে হয়, এ ব্যাপারে কারও কোনো দায় নেই! শহরকে সুন্দর পরিচ্ছন্ন রাখতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর হাতে দুশ’ টাকা তুলে দিয়ে ময়লা দিতে রাজি নন, অথচ চুপটি করে রাস্তায় কিংবা নদীতে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছে। সুতরাং, আগে নিজেদের সভ্য হতে হবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, নরসুন্দার দখল-দূষণমুক্ত করে নাব্য ফিরিয়ে আনতে অচিরেই জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আশাবাদী, অচিরেই নরসুন্দা তার হৃত গৌরব আংশিক হলেও ফিরে পাবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাফার জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক জুয়েল আমাদের সময়কে বলেন, আমরা নরসুন্দাকে নিয়ে আর কতদিন ব্যানার নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালে, আর কত স্মারকলিপি দিলে আমাদের প্রাণের নরসুন্দা তার নাব্য ফিরে পাবে?
সচেতন নাগরিক কমিটি সনাকের সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুল গনি আমাদের সময়কে বলেন, নরসুন্দার সেকাল আর একাল দেখলে খুব কষ্ট হয়। বহুকাল আগে গড়ে উঠা নদীমাতৃক সভ্যতা আজ যেন দখল-দূষণে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, একসময় শুনতাম, চীনের দুঃখ হুয়াংহু নদী, আজ আমাদের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে নরসুন্দা নদী।
তিনি বর্তমান এমপি, প্রশাসন ও পৌরসভার কাছে জোর দাবি জানান, অবিলম্বে দখলদারদের উচ্ছেদ করে কচুরিপানা-ময়লা-আবর্জনা নরসুন্দা থেকে পরিষ্কার করে, খনন করে নরসুন্দার নাব্য ফিরিয়ে দেওয়ার।
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এটি কিশোরগঞ্জবাসীরও প্রাণের দাবি।
