ফুটবল মাঠে হলুদ বা লাল কার্ড উঁচিয়ে ধরে খেলোয়াড়কে সতর্ক করার দৃশ্য বহুদিনের পরিচিত। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই পদ্ধতিতেও আসতে পারে পরিবর্তন। উরুগুয়ের একটি ম্যাচে প্রচলিত হলুদ কার্ডের বদলে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেছেন রেফারি। অভিনব এই উদ্যোগ ঘিরে উঠেছে প্রশ্ন, ভবিষ্যতে কি ঐতিহ্যবাহী কার্ডের জায়গা নেবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা?
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) উরুগুয়ে কাপের ম্যাচে ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের লড়াইয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ডিভাইসটি ব্যবহার করেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। তবে এর মূল লক্ষ্য কার্ড দেখানোর দৃশ্য বদলে দেওয়া নয়, বরং মাঠের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলো ডিজিটালভাবে নথিবদ্ধ করে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার (১৬ অক্টােবর) উরুগুয়ের রেডিও এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফুটবলে একমাত্র যে বিষয়টি এখনো অ্যানালগ রয়েছে, আমরা সেখানে প্রযুক্তি নিয়ে আসতে কাজ করছি।’
যেভাবে এল ডিজিটাল কার্ডের ধারণা
এই উদ্যোগের শুরু তিন বছরেরও বেশি সময় আগে। বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন সাকো ও তার সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা।
তারা লক্ষ্য করেন, মাঠে কোনো খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সংশ্লিষ্ট ঘটনা হাতে লিখে নথিবদ্ধ করতে হয়। পরে সেই তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হয়। একই তথ্য দুবার লেখার এই প্রক্রিয়া সহজ করার চিন্তা থেকেই তৈরি হয় ডিজিটাল কার্ডের ধারণা।
নতুন ডিভাইসটি ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা সময়সহ রেকর্ড করতে পারে। এর মাধ্যমে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক ম্যাচ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কাজ দ্রুত ও সহজ করাই নির্মাতাদের উদ্দেশ্য।
প্রশাসনিক কাজে সুবিধা, কমতে পারে নাটকীয়তা
পরীক্ষামূলক ডিভাইসটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়েছেন রেফারি ভারেলা। তার মতে, যন্ত্রটি হাতে ব্যবহার করা আরামদায়ক এবং এর সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করে। তবে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি ফুটবলের পরিচিত দৃশ্যের একটি বিশেষ আকর্ষণ হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
ভারেলার ভাষায়, ‘দ্রুত কার্ড দেখানোর সেই জাদুকরি ব্যাপারটি কিছুটা হারিয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় এটি আমাদের অনেক সাহায্য করবে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে।’
অর্থাৎ, রেফারিদের জন্য সিদ্ধান্ত নথিবদ্ধ করার প্রক্রিয়া সহজ হলেও দর্শকদের কাছে কার্ড দেখানোর পরিচিত নাটকীয়তা ধরে রাখা এই প্রযুক্তির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সূর্যের আলোয় স্ক্রিন দেখা নিয়ে সমস্যা
প্রাথমিক পরীক্ষায় ডিভাইসটির দৃশ্যমানতা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সূর্যের আলোয় স্ক্রিন স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় এর আগের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবারের ম্যাচেও মাঠের দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ ডিভাইসে দেখানো সিদ্ধান্ত বুঝতে অসুবিধায় পড়েন।
দে লা পেনা মনে করেন, প্রযুক্তিটির আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রকল্প, যাতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। টিভির চেয়ে মাঠে এটি ভালো দেখা গেছে। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সব দর্শকের জন্য এর মান উন্নত করা। হলুদ কার্ডকে হলুদ হতে হবে, লাল কার্ডকে লাল হতে হবে এবং মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।’
সমস্যা সমাধানে ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন নির্মাতারা। সাকো জানিয়েছেন, ব্র্যান্ডটি নিবন্ধিত হয়েছে এবং এর হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্টও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপারদের কার্যক্রমের ভিত্তি চীনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
নতুন প্রযুক্তি নিয়ে অনলাইনে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ উদ্যোগটিকে ফুটবলে প্রযুক্তির ইতিবাচক সংযোজন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ঐতিহ্যবাহী কার্ডের বদলে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা করছেন।
দে লা পেনা বলেন, ‘আমরা নানা ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখেছি। এমনকি আমরা মিম দেখে হেসেছিও। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ এটি নিয়ে কথা বলছে। যেকোনো নতুন উদ্ভাবনেই কিছুটা সময় লাগে।’
ফিফার স্বীকৃতি কি মিলবে?
আপাতত ডিজিটাল কার্ড পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে। দৃশ্যমানতা ও ব্যবহারিক কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি প্রযুক্তিটিকে মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে আরও উপযোগী করে তোলার কাজ চলছে। নির্মাতাদের আশা, প্রয়োজনীয় উন্নয়ন শেষে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হবে।
তবে প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গা এই ডিভাইস নেবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। আপাতত এর প্রধান উদ্দেশ্য রেফারিদের কাজের প্রক্রিয়া সহজ করা। প্রযুক্তিটি কতটা কার্যকর হয় এবং সংশ্লিষ্ট ফুটবল কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে মাঠে কার্ড দেখানোর পরিচিত দৃশ্যের ভবিষ্যৎ।
