চীনের এই বিস্তৃত ‘কম্প্যানিয়নশিপ ইকোনমি’ বা সঙ্গ দেয়ার অর্থনীতির আকার ২০২৫ সালে ছিল আনুমানিক ৫০ বিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৭৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে শুধু বয়স্কদের দেখাশোনা নয়, তরুণদের ভ্রমণসঙ্গী কিংবা অবসর কাটানোর সঙ্গী হওয়ার মতো পরিষেবাও রয়েছে
কথা বলার কেউ না থাকলে আমি টেলিভিশনের সঙ্গে কথা বলতাম— চীনের বেইজিংয়ের উপকণ্ঠে বসবাসকারী ৯১ বছর বয়সী ইয়াংয়ের এই স্বীকারোক্তিতে আধুনিক জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য ধরা পড়ে। স্বামীকে হারানোর পর একসময় নিঃসঙ্গতা তার কাছে এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে বেঁচে থাকার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলেছিলেন। সম্প্রতি বিবিসিকে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তুলে ধরেছেন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে মানুষের অভাব নেই, কিন্তু সঙ্গের অভাব ক্রমেই প্রকট।
সেই নিঃসঙ্গ জীবনে পরিবর্তন আসে যখন ওয়াং ইংওয়েই ও তার ছোট একটি দল নিয়মিত ইয়াংয়ের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। তারা খাবার পৌঁছে দেন, ঘরের ছোটখাটো সমস্যা মেরামত করেন, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করেন। কিন্তু তাদের কাজের গুরুত্ব শুধু সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা সময় দেন, কথা বলেন, খোঁজখবর নেন। ইয়াং তাদের নিজের সন্তানের মতো ভাবতে শুরু করেন। ওয়াংয়ের দলও নিজেদের পরিচয় দেয় ‘কমিউনিটি চিলড্রেন’ হিসেবে, যেন আত্মীয়তার অনুপস্থিতিতে সামাজিক সম্পর্কের নতুন একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
ইয়াং
এই সম্পর্কের পেছনে রয়েছে একটি ব্যবসায়িক ধারণা, যা প্রথম শুনলে অদ্ভুত মনে হতে পারে। চীনে নিঃসঙ্গ মানুষের পাশে থাকার জন্য গড়ে উঠছে অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ দেয়ার বিভিন্ন পরিষেবা। কোথাও বৃদ্ধদের দেখাশোনা, কোথাও হাসপাতালে যাওয়ার সময় সঙ্গ দেয়া, আবার কোথাও পাহাড়ে ওঠা কিংবা বাইরে খেতে যাওয়ার জন্য সঙ্গী ভাড়া করা যায়।
২০২৬ সালের জুনে রয়টার্স জানায়, চীনের এই বিস্তৃত ‘কম্প্যানিয়নশিপ ইকোনমি’ বা সঙ্গ দেয়ার অর্থনীতির আকার ২০২৫ সালে ছিল আনুমানিক ৫০ বিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৭৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে শুধু বয়স্কদের দেখাশোনা নয়, তরুণদের ভ্রমণসঙ্গী কিংবা অবসর কাটানোর সঙ্গী হওয়ার মতো পরিষেবাও রয়েছে।
তবে এই ব্যবসাকে কেবল মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয় হিসেবে দেখাও ভুল হবে। পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকলে, বয়স্ক মানুষ একা বসবাস করলে কিংবা হাসপাতালে যাওয়ার মতো সাধারণ কাজেও সহায়তার প্রয়োজন হলে, অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সঙ্গ বাস্তব উপকার করতে পারে। ইয়াংয়ের ক্ষেত্রে এই সহায়তা তার দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে। একইসঙ্গে এমন পরিষেবা পরিবারের ওপর চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পেশাদার পরিচর্যা, চিকিৎসাসেবা এবং মানসিক সঙ্গ যে এক জিনিস নয়, সেই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া, বয়স্ক মানুষের যত্নের প্রয়োজন এবং বদলে যাওয়া পারিবারিক কাঠামো। এসব পরিবর্তন শুধু চীনের নয়। পৃথিবীর নানা সমাজেই মানুষ কাজের প্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে যাচ্ছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমছে, আর ব্যস্ততার মধ্যে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে সব সমাজে নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতা এক নয়, আর চীনের এই বাজারকে বিশ্বের সব মানুষের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা যায় না।
হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের সময়, মনোযোগ ও সঙ্গের জন্য আরও নানা ধরনের পরিষেবা তৈরি হবে। সেগুলো প্রয়োজনও মেটাবে। তবে নিঃসঙ্গতারও বাজারদর থাকতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের কাছে আরেকজন মানুষের উপস্থিতির মূল্য সব সময় অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আর যে পৃথিবীতে পাশে বসে কারো কথা শোনার জন্যও অর্থ খরচ করতে হয়, সেখানে প্রশ্নটি শুধু কে কতটা নিঃসঙ্গ, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষের প্রয়োজনীয় সঙ্গটুকুও ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত হচ্ছে?
