বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছে ডেঙ্গু জ্বর এখন আর সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং এটি একটি ভয়াবহ মানবিক সংকট ও জাতীয় জরুরি অবস্থা। ২০২৩ সালেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার অতিক্রম করে, যা দেশের ইতিহাসে বার্ষিক আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড। ওই মহামারির থাবায় প্রাণ হারায় ১ হাজার ৭০৫ জন মানুষ, যা ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৪-২৫ সালের প্রারম্ভিক তথ্যও অত্যন্ত হতাশাজনক ধারার ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে হাসপাতালে ভর্তির হার ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় শতকরা হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় কালি নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একেকটি মা-বাবার বুকচিরে যাওয়া কান্না এবং একেকটি শিশুর অসময়ে ঝরে যাওয়া জীবন। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, একে কেবল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একক দায়িত্ব না ভেবে সামগ্রিক জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখতে হবে।
ডেঙ্গুর মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিঃশব্দ কিন্তু ধ্বংসাত্মক প্রভাব, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করছে। বিগত চার দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য মনে হলেও ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বংশবৃদ্ধির হারকে নাটকীয়ভাবে ত্বরান্বিত করেছে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হওয়ার সময়কাল কমে আসে; ফলে একই সময়ে বেশিসংখ্যক মশা রোগ ছড়াতে সক্ষম হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত ও অনাকাক্সিক্ষত ধরন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের বৃষ্টিপাতের চিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেরিতে মৌসুমি বৃষ্টির প্রাবল্য বেড়েছে, যা মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে প্রচলিত ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে প্রায় বছরব্যাপী বিস্তৃত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক বাস্তবতা যখন আমাদের দোরগোড়ায়, তখন গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীÑ যাদের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পৌঁছানো কঠিন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। বর্তমান জলবায়ুজনিত পরিবর্তন আমাদের শেখাচ্ছে যে প্রকৃতির সঙ্গে আপসহীন লড়াইয়ের পরিবর্তে প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি বুঝে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তবে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র কারণ নয়; দ্রুত ও পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশগত অবক্ষয় উদ্ভূত সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ঢাকার মতো অত্যধিক জনবহুল শহরগুলোয়, যেখানে অবকাঠামোগত সুবিধার চেয়ে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি, সেখানে ডেঙ্গু বাহক মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা এর একটি প্রধান নিদর্শন। দুঃখজনক হলেও সত্য, শহুরে এলাকায় উৎপাদিত কঠিন বর্জ্যরে প্রায় ৫৫ শতাংশই অপসারণ করা হয় না বা অবহেলিত থাকে। জমতে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ও আবর্জনায় বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার ডিম পাড়ার নিরাপদ ও স্থায়ী আসনে পরিণত হয়। এ ছাড়া ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারণমান নির্মাণকাজও আলোচ্য সংকটের একটি বিশাল ও উপেক্ষিত উৎস। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের বহুতল ভবনগুলো ডেঙ্গু বাহক মশার প্রজননস্থলের ৪৫ শতাংশের বেশি দখল করে আছে, আর নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলো এর প্রায় ৩৫ শতাংশ। পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা, খোলা পানির ট্যাংক এবং নির্মাণসামগ্রীর ফাঁকে জমে থাকা বৃষ্টির পানি মশার বংশবিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের নগর পরিকল্পনা, পৌরসভা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার চরম ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত দলিল।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় যে প্রতিক্রিয়াশীল ও রাসায়নিক-নির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছি, তা এখন কার্যকারিতা হারিয়ে উল্টো নতুন জটিলতার সৃষ্টি করছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মশা নিধনে ব্যাপক হারে কীটনাশক ছিটানো বা ফগিং করাকে আমরা চূড়ান্ত সমাধান ভেবে আসছি; কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এডিস মশার মধ্যে ইতোমধ্যেই কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, যে রাসায়নিক দিয়ে আমরা একসময় মশা মারতাম, তাতে আজ আর মশা মরছে না; বরং তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসছে। রাসায়নিক-নির্ভরতার এই চর্চা কেবল মশার ক্ষেত্রেই নয়; আমাদের পরিবেশ, মাটি, পানি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। তাই কেবল মশা মারার লড়াই থেকে সরে এসে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের দিকে নজর দিতে হবে। কাজটি সহজ নয়, তবে এটিই একমাত্র টেকসই পথ। আমাদের বুঝতে হবে যে সুস্থ পরিবেশ ছাড়া সুস্থ মানুষ গড়ে তোলা অসম্ভব; আর পরিবেশ সুস্থ রাখতে হলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করেই হস্তক্ষেপ করতে হবে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়।
জটিল ও বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত এবং আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণা এবং সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা কৌশলই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। ‘ওয়ান হেলথ’-এর মূল কথা হলোÑ মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; একটির অবনতি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। ওই দর্শন কাজে লাগিয়ে সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা কৌশলে কেবল রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, উন্নত নগর পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণকে একসূত্রে গাঁথা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলো আবহাওয়া ও পরিবেশগত তথ্যের সঙ্গে রিয়েল-টাইম রোগ নজরদারির ব্যবস্থা যুক্ত করে কয়েক সপ্তাহ আগেই ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও যদি আমরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তথ্য এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগীর তথ্যকে একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে পারি, তবে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থা থেকে সরে এসে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এটি কেবল সরকারের একার কাজ নয়; বরং এখানে প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা ও দৈনন্দিন জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যে।
জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম কেবল ডেঙ্গু মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী আচরণগত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করতে হবে; বিশেষ করে পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য নিষ্কাশন ও দ্রুত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে। ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সফল মডেলগুলো আমাদের দেখায় যে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ ও স্কুলভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে পারলে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। নগর পরিকল্পনায় জলবায়ুবান্ধব জোনিং, বাধ্যতামূলক উন্নত পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং মশা-নিরাপদ নির্মাণ বিধিমালা প্রবর্তন করতে হবে; বিশেষ করে সেসব বহুতল ভবন ও নির্মাণাধীন স্থাপনায়, যেগুলো বর্তমানে মশার প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিগণিত। ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়, এটি একটি অত্যন্ত অর্জনযোগ্য লক্ষ্যÑ যদি আমরা আজই আমাদের চিন্তা ও কাজের ধরন বদলাই। মনে রাখতে হবে, অসচেতনভাবে ফেলা প্রতিটি প্লাস্টিকের বোতল যেমন ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি প্রতিটি পরিষ্কার ড্রেন এবং প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপ আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যতের ইট গেঁথে দেয়। জাতীয় দায়িত্ব পালনে আমরা সবাই সমানভাবে অংশীদার এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ‘এক স্বাস্থ্য’নীতি বাস্তবায়ন ও টেকসই জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম করতে।
