কুড়িগ্রামের উলিপুরে ভিন্ন পরিচয়ে প্রেম ও বিয়ের আয়োজন ঘিরে সৃষ্ট ঘটনার পর নাজমা খাতুন (৪০) নামে এক নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ; স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করে যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কুড়িগ্রামের উলিপুরে গোয়াল ঘরের আড়ার সাথে ফাঁসিতে ঝুলে নাজমা খাতুন (৪০) নামে এক নারী আত্মহত্যা করেছে। ওই নারী ফেসবুকে মুসলিম পরিচয় দেয়া এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে প্রেমিকার বাড়িতে ওই যুবক স্বাক্ষাত করতে এসে আটক হয়। এ সময় বিয়ের আসরে বসে ওই যুবক হিন্দু বলে সনাক্ত হওয়ায় বিয়ে আটকে দেন এলাকাবাসী। পরে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দেনদরবারে লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মিমাংসা হওয়া এবং এলাকাবাসীর অপবাদ সইতে না পেরে ওই নারী আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী ও নিহত নারীর স্বজন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ধামশ্রেনী ইউনিয়নের পশ্চিম নাওড়া এলাকার আব্দুল খালেকের (স্বামী পরিত্যাক্তা) কন্যা নাজমা খাতুন প্রায় ৬ মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সাইদুর রহমান পলাশের সাথে প্রেমের সম্পর্ক চলে আসছিল। এ সময় পলাশ নিজেকে রেল পুলিশের সদস্য দাবী করেন এবং বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে প্রতারনার মাধ্যমে নাজমার কাছ থেকে স্বর্ণসহ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পলাশ ওই নারীর সাথে দেখা করার জন্য পশ্চিম নাওড়া এলাকায় আসে। এ সময় অপরিচিত যুবকের উপস্থিতি সন্দেহজনক হলে এলাকাবাসী উভয়কে আটক করেন। এরপর রাতেই উভয়ের সম্মতিতে এলাকাবাসী বিবাহের আয়োজন করেন।
কিন্তু বিবাহের রেজিষ্ট্রির জন্য যুবকের জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে ঘটে বিপত্তি। এ সময় প্রতারক পলাশের সঠিক পরিচয় বেড়িয়ে আসে। ওই যুবক পার্শ্ববর্তী পান্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকার অমল চন্দ্রের ছেলে দুলাল চন্দ্র (৫৩) বলে সবাই জানতে পারেন। পরবর্তীতে বিবাহ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং ছেলেকে আটক করে রাখা হয়। এ ঘটনা প্রকাশ হলে ধামশ্রেনী ও পান্ডুল ইউনিয়নের প্রভাবশালী মহল বিষয়টি মিমাংসা করতে তৎপর হয়ে উঠেন।
রোববার ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় নাজমুল হক, মাহমুদুল হাসান সুজন ও গ্রাম পুলিশ সৈয়দ আলীসহ অনেকে বলেন, শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সফি কামালসহ বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউল হক বাদলসহ উভয় পক্ষের অনেকেই বিষয়টি সমাধান করতে ঘটনাস্থল থেকে অদূরে উলিপুর পৌর শহরের এক জায়গায় বসে মিমাংসা করেন। এ সময় পলাশ ওরফে দুলাল চন্দ্র ও নাজমা খাতুনকে না জানিয়ে ওই প্রভাবশালী মহল লাখ টাকার বিনিময়ে মিমাংসা করে যুবককে ছেড়ে দেন বলে তারা অভিযোগ করেন।
এদিকে হিন্দু যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ে না দিয়ে প্রভাবশালী মহল বিষয়টি মিমাংসা করে যুবককে ছেড়ে দেয়ায় সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে অপবাদ সইতে না পেরে রোববার দুপুরে নাজমা খাতুন নিজ বাড়ির গোয়াল ঘরের আড়ার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে সকলের অজান্তে আত্মহত্যা করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান।
ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম মিমাংসায় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, সেখানে পান্ডুল বিএনপির নেতা জিয়াউল হক বাদলসহ আমরা অনেকেই উপস্থিত ছিলাম। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় শনিবার রাতে উভয় পক্ষের স্বজনদের নিয়ে মিমাংসা করা হয়। সেখানে ওই নারীর ক্ষতিপূরন বাবদ প্রতারক যুবকের ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং সকলের উপস্থিতিতে মেয়ের স্বজনদের টাকা বুঝে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর রোববার ওই নারীর আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কি কারনে আত্মহত্যা করেছেন তা আমার জানা নেই।
পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউল হক বাদলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, মরদেহ উদ্ধার করে বিকালে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। সোমবার সকালে ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হবে। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহতের ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা দিয়েছে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
