সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) চলতি বছরের ১০ মাসে বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাত শিক্ষার্থী। বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকেনি অক্টোবরেও। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কয়েকটি ঘটনায় একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে ক্যাম্পাসজুড়ে শোকের আবহ আরও গভীর হয়েছে। অকালেই নিভে যাওয়া এসব প্রাণের সঙ্গে হারিয়ে গেছে পরিবারের আশা, স্বজনদের স্বপ্ন আর সহপাঠীদের প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাত শিক্ষার্থীর মধ্যে তিন জনেরই মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে, দুজন সড়ক দুর্ঘটনায়, একজন আকস্মিক অসুস্থতায় এবং অন্যজন কীটনাশক পান করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তাঁদের প্রত্যেকের মৃত্যুর ঘটনা আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকা অবস্থায়ই তাঁদের জীবন থেমে গেছে।
গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র লালাখালে পানিতে ডুবে মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুসআব আমীন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে লালাখালে ঘুরতে গিয়ে গোসল করতে পানিতে নামেন মুসআব। তথ্য অনুযায়ী, তিনি সাঁতার জানতেন না। একপর্যায়ে পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রতন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
১৫ মে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দিতে ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারান শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত বণিক। তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী বাজার এলাকায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন নদীতে তিন বন্ধু মিলে গোসল করতে নামেন শান্ত। এ সময় পানির গভীরতা ও তীব্র স্রোতে তিনি তলিয়ে যান। পরে তাঁকে উদ্ধারে কাজ শুরু হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের চৌকিদিখি এলাকার ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ। সন্ধ্যার দিকে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। পরে সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে নগরের দরগাহ গেট এলাকার নূরজাহান হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
১১ অক্টোবর সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদাত রহমান নাবিল। কোনো কোনো প্রকাশিত তথ্যে তাঁর নামের সঙ্গে ‘সাদমান’ নামটিও এসেছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
নাবিলের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই ১২ অক্টোবর মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান। হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যুর সর্বশেষ ঘটনাটি শাহরিয়ার বাঁধনের। রসায়ন বিভাগের এই শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যে গত ৪ অক্টোবর কীটনাশক পান করেন। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ অক্টোবর দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনে শাবিপ্রবির আরও এক শিক্ষার্থীর জীবনাবসান হলো। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয় দিনের লড়াইয়ের পরও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
শাবির রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইকবাল আহমেদ সিদ্দিকী জানান, প্রাথমিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও কলহের জেরে বাঁধন বিষপান করেছিলেন।
