ছবি: খবরের কাগজ
-->বনশ্রী নামটা যে কবে কখন কে
রেখেছিল কেউ বলতে পারে না।
গ্রামের বুড়োরা বলে, ‘নাজমুন
নাহার? ওটা কার নাম?’
মাঠঘাট, বনবাদাড়,
ঝোপজঙ্গল, বাগান, স্কুল কলেজ–
সর্বত্র এখন শুধু ‘বনশ্রী’।
নাজমুন নাহার। প্রাইমারিতে
সাঁতার প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট। পুকুরের পানিতে সে যখন
ডুব দিত, মনে হতো মাছের মতো পাখা গজিয়েছে।
অনেকক্ষণ পর ভুস করে ভেসে উঠত।
ফুটবল খেলায় ছেলেরাও তাকে ধরতে পারত
না। দৌড়ে যেন বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিত। বনজঙ্গল,
ঝোপজঙ্গল–কোথাও তার ভয় ছিল না।
সেদিন ছিল ভাদ্রের দুপুর। আকাশে মেঘ। ভুট্টার
মাঠ কোমরসমান। বাতাসে ভুট্টার পাতা মৃদুমন্দ সবুজ
মায়াবী শব্দে বিভোর ছিল।
নাজমুন ভুট্টার মাঠে কচি পাতায়, সজনে ডাঁটার
মতো নরম হাত দুটো দিয়ে আদর করতে করতে হেঁটে
যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন হাত ধরে।
‘ভয় পেও না। আমি।’
সজীব। পাশের বাড়ির ছেলে। বয়সে দুই
বছরের বড়। চোখে চশমা, হাতে খাতা, কবিতা
লেখার খাতা। গ্রামের সবাই বলে ‘মাস্টার না হয় কবি
হবে’।
সজীব তাকে ভুট্টার ঘন ঝোপের ভিতর টেনে
নিয়ে যায়। কানে কানে ফিসফিস করে বলে,
‘তুমি আমার বনশ্রী। এই মাঠঘাট, বনজঙ্গলে তুমি
না থাকলে জেগে ওঠে না সুন্দর প্রকৃতি। হাসে না,
দোলে না আকাশ বাতাস। তুমি না থাকলে এই ভুট্টার
শীষেও দানা বাঁধে না বনশ্রী।’ বনশ্রী কিছুই বলতে
পারে না। হঠাৎ কী হতে কী হয়ে গেল!
নাজমুনের বুক ধড়ফড় করছিল। সে কিছু বলল
না। শুধু বাড়ি এসে, রাতের গভীরে, খাতার প্রথম
পাতায়, বড় বড় করে লিখে রাখে–বনশ্রী।
হাইস্কুল পেরিয়ে বনশ্রীভর্তি হয় খুলনা মহিলা
কলেজে। মেসে থাকা শুরু করে। ছুটিতে যাতায়াত
করে ট্রেনে।
নতুন শহর, নতুন পরিবেশে নতুন নতুন বান্ধবী।
‘তোমার নাম কী?’
‘বনশ্রী।’
ধীরে ধীরে নাজমুন নাহার নামটা মুছে যায়। সবাই ডাকে
বনশ্রী।
সজীব এক বছর আগেই ঢাকা কলেজে ভর্তি
হয়েছে। মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করে।
পুজোর রাতে মাইকে বাজত, ‘মন মাঝি তোর
বৈঠা নে রে... অথবা হরে হরে হরে কৃষ্ণ...’
হিন্দুর ছেলে মুসলমানের মেয়েকে প্যান্ডেল
ঘুরিয়ে দেখায়। কেউ কিছু বলে না, মনেও করে না। মহাসম্প্রীতির বসবাস।
কিন্তু আকাশে মেঘ জমছিল। গ্রামের মানুষ বুঝতে
পারেনি।
সময় গড়ায়। টিভি আসে, মোবাইল হাতে পায়।
সঙ্গে আসে কিছু ‘ধর্মের ঠিকাদার’।
প্রথমে ছোট ছোট কথা। ‘পুজোর মাইক জোরে বাজে, একটু ডিস্টার্ব হয়।’
তার পর বড় কথা। ‘মুসলমানের মেয়ে হিন্দুর মেলায় যাওয়া নাজায়েজ?’
একদিন মসজিদের মাইকে ঘোষণা, ‘মুসলমান
মেয়েদের পুজোর মেলায় যাওয়া হারাম। শুরু হয়
ফতোয়া দেওয়া।’
আরেকদিন মন্দিরের সামনে পোস্টার, ‘আমাদের উৎসবে ওদের নাক গলানো চলবে না, আমরা
মুসলিম।’
গ্রামটা যেন দুই ভাগ হয়ে যায়, আরেক ভাগ
লালন অনুসারীরা নীরব থাকে। একটা কাচের গ্লাস
ফেটে তিন টুকরা হতে থাকে।
বনশ্রী কলেজ থেকে ফিরে দেখে–পাশের বাড়ির
কাকীমা আর কথা বলে না।
সজীব ফোনে বলে, ‘বনশ্রী, সাবধানে থেকো।’
আশ্বিনের পূর্ণিমা। আকাশে থালার মতো চাঁদ।
নদীর পানি রুপার মতো চকচক করে।
গ্রাম শান্ত। মারামারির পর মানুষ ক্লান্ত।
সজীব ঢাকা থেকে এসেছে। ফোন দেয়, ‘বনশ্রী,
নদীর পাড়ে আসবা? একবার?’
বনশ্রী মা-কে বলে, ‘মা, একটু হাঁটতে যাই।’
হালিমা বেগম কিছু বলে না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সজীব দাঁড়িয়ে। বনশ্রী আসে। দুজনেই চুপ।
অনেকক্ষণ পর সজীব বলে, ‘ভয় পাও?’
বনশ্রী বলে, ‘তোমাকে পেলে ভয় কেটে যায়।’
সজীব বনশ্রীর হাত ধরে। ‘আমরা কি পারব? এই গ্রাম, এই মানুষ, এই ফতোয়া–সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে
মানুষ হতে?’
বনশ্রী নদীর দিকে তাকায়। মনে পড়ে ভুট্টার
মাঠের সেই ফিসফিসানি।
‘তুমি না থাকলে আকাশ বাতাস দোলে না।’
আজ সে জানে–দোলাতে হলে প্রথমে নিজেকে
দুলতে হয়।
ট্র্যাজেডি এসেছিল। বিভেদ এসেছিল। কিন্তু
ভালোবাসা আর জেদ–ওই দুটা থাকলে অমাবস্যার
রাতেও আলো ফোটে।
এখন গ্রামের সবাই জানে–বনশ্রী মানে শুধু
একটা মেয়ে না।
বনশ্রী মানে প্রতিবাদ। বনশ্রী মানে সম্প্রীতি
