চাকরিতে প্রবেশের পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করলে পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা সংশোধন করে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধনের পূর্ণ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে সংশোধিত বিধান ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগে অর্জিত আইনি অধিকার ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে কর্মরত সাতজনের পদোন্নতি-সংক্রান্ত রিট নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী আবেদনকারীদের ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদ শূন্য থাকা এবং পদোন্নতির অন্যান্য আইনানুগ শর্ত পূরণসাপেক্ষে এক মাসের মধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এ রায় দেন। সম্প্রতি ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ। বারির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
যেভাবে তৈরি হয় পদোন্নতির জটিলতা
রায়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ সাতজন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে যোগ দেন। পরে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।
‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০১১’ অনুযায়ী, ফিডার পদে পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জনের পর উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ ছিল। আবেদনকারীদের দাবি, ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তারা পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরিকালসহ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেন।
তবে ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার নতুন প্রবিধানমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এতে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের শতভাগ পদোন্নতির বিধান পরিবর্তন করে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। যদিও ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে শতভাগ পদোন্নতির কোটা বহাল রাখা হয়।
নতুন প্রবিধানমালার কারণে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় নিজেদের অর্জিত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন সাত প্রকৌশলী। এ অবস্থায় ২০২১ সালে তারা হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
দুপক্ষের যুক্তি
রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ আদালতে বলেন, নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তার মক্কেলরা পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেছিলেন। তাই পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা সংশোধন করে তাদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত করা আইনসংগত নয়। এতে তাদের অর্জিত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং বৈষম্যের প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বারির আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন, ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে পুরোনো প্রবিধানমালার অধীনে পদোন্নতি দাবি করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া সিভিল শাখায় উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করতে বিএসসি ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
রায়ে যা বললেন হাইকোর্ট
দুই পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, প্রবিধানমালা সংশোধনের আগেই যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। তারা ২০১১ সালের প্রবিধানমালার অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরবর্তী সময়ে প্রবিধান পরিবর্তন করে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া আইনসংগত নয়।
আদালত আরও বলেন, নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে যারা পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছেন, তাদের পদোন্নতির বিষয়টি পুরোনো প্রবিধান অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে। নতুন প্রবিধানমালায় যুক্ত করা কোনো শর্তের কারণে তাদের আগে অর্জিত যোগ্যতা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আদালত রিটের রুল আবেদনকারীদের পক্ষে নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ২০২১ সালের প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী সাত আবেদনকারীর বিষয়টি ২০১১ সালের প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী বিবেচনার নির্দেশ দেন।
পাশাপাশি পদ শূন্য থাকা, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও পদোন্নতির অন্যান্য আইনানুগ শর্ত পূরণসাপেক্ষে এক মাসের মধ্যে পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। রায় ও আদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবিলম্বে অবহিত করার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
