পাঠ্যবইয়ের ইন্সপেক্টর, অথচ জানেনই না, কীভাবে বইয়ের মান যাচাই করতে হয়? রাজধানীর অন্তত ১০-১২টি প্রেস ঘুরে এমনই চিত্র পেয়েছে, স্টার নিউজ। যেখানে দেখা গেছে, কোথাও নির্ধারিত ব্যক্তির বদলে দায়িত্ব পালন করছেন অন্য কেউ। আবার কোথাও ইন্সপেকশনের প্রতিনিধি কলেজ শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত বই তুলে দিতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি এবং মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মাঝখানে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করে ইন্সপেকশন এজেন্ট। তাদের দায়িত্ব, ছাপার প্রতিটি ধাপে বইয়ের মান যাচাই করা, যাতে নির্ধারিত মানের বাইরে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করতে না পারে। কিন্তু, এই এজেন্টদের অদক্ষতায় বড় গলদ থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্টার নিউজ বিভিন্ন প্রেসে ঘুরে এরকম অনেকগুলো বই সংগ্রহ করেছি। এনসিটিবির বেঁধে দেয়া যে মান, তা কতটুকু রক্ষা করা হচ্ছে, এখন আমরা সেটাই দেখার চেষ্টা করে। কাগজের মান যাচাই হয়, সাধারণত জিএসএম, ব্রাইটনেস, বার্স্টিং ফ্যাক্টর, অপাসিটি (স্বচ্ছতা-অস্বচ্ছতা), কব (পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা), কাগজের ধরন ও পুরুত্ব দিয়ে।
স্টার নিউজের হাতে থাকা প্রায় সব প্রেসের বইয়ের জিএসএম ঠিক থাকলেও, কিছু প্রেসের বইয়ে ব্রাইটনেস নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম রয়েছে।
বার্স্টিং ফ্যাক্টর বা কাগজের শক্তির পরিমাণ ন্যূনতম ১৮ হওয়ার কথা থাকলেও, মিলেছে ১৫-এর আশপাশে। অপাসিটি বা স্বচ্ছতা-অস্বচ্ছতা অন্তত থাকতে হবে, ৮৭ শতাংশ। কিন্তু রয়েছে ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া, স্পট ফ্রির শর্তও মানা হয়নি।
যে ৩ প্যারামিটারে কাগজের দাম কম-বেশি হয়, ল্যাবের পরীক্ষায় সেই ব্রাইটনেস, ব্রাস্টিং এবং অপাসিটি এনসিটিবির বেঁধে দেয়া মানের চেয়ে কম পেয়েছে স্টার নিউজ। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে যেসব প্রেস এসব কাগজে বই ছাপছে, তারা কম দামি কাগজ দিয়ে বেশি মুনাফা লাভের পথে হাঁটছে। আর এই সুযোগটাই পাচ্ছে ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতায়।
প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ের তদারকির দায়িত্ব পেয়েছে, ইনফিনিটি এবং মাধ্যমিকের পেয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্সপেকশন। স্টার নিউজের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন অভিযোগ সবচেয়ে বেশি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্সপেকশনের বিরুদ্ধে। কিন্তু, ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি প্রতিষ্ঠানটির এমডি শেখ বেলাল হোসেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ বেলাল হোসেন বলেন, আপনি যদি কারও এজেন্ডা নিয়ে আসেন, তাহলে আমি যা-ই বলি না কেন, তা আপনার পছন্দ হবে না। আপনি যদি শতভাগ লোককেই যোগ্য ও অভিজ্ঞ চান, তাহলে কেউই তা দিতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা, এ বিষয়ে আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।
এমন পরিস্থিতির জন্য এনসিটিবিকেই দায়ী করছেন, বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক এই সভাপতি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান জানান, এই ইউনিটের ইনচার্জ হলেন মেম্বার ট্যাক্স। উৎপাদন ও বিতরণের দায়িত্ব তার। তিনি টেন্ডার নেন এবং লোক নিয়োগ করেন। অভিযোগও তার কাছেই যায়। অভিযোগ পাওয়ার পর তার সেগুলো আমলে নেয়ার কথা। কিন্তু এত কিছু ঘটলেও তিনি কিছুই করছেন না। তাহলে তার আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে, এ কথা বলার আর কোনো অবকাশ থাকে না।
তবে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজেকে নিরপরাধ দাবি করলেও, ক্যামেরায় কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে, এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, দেখছেন? এগুলো আমি শতভাগ বিশ্বাস করছি। এগুলো সত্য কথা, পুরোপুরি সত্য। আপনি একটাও মিথ্যা কথা বলেননি। কেউ কেউ বলছেন, ওই ব্যক্তিকে নাকি আমি আশ্রয় দিই। যিনি আপনাকে এ কথা বলেছেন, তার সঙ্গে তদন্ত করে দেখুন না। এ বিষয়ে আমি আর কী বলব? বাংলাদেশের ১০০ জন সৎ মানুষের মধ্যে আমি একজন।
দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, এবার যিনি কাজ পেয়েছেন, তার কাজে আমরা কিছু দুর্বলতা পেয়েছি। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আমাদের মনিটরিং টিম জোরালোভাবে কাজ করছে। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটিও আমরা নিচ্ছি।
নিম্নমানের বই ছাপানোর অভিযোগে এরই মধ্যে ২০টির বেশি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি।
