বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে মন্থর গতি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশ নেয় বাংলাদেশ। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ সভা ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক অর্থায়ন বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এ জন্য বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থায়ন, সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ এবং আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া না গেলেও ভবিষ্যৎ অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং সংস্কার নিয়ে সমঝোতা বাংলাদেশের প্রধান প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিন বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় বাংলাদেশ : সভা শুরুর প্রথম দিনেই বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য আর্থিক সুরক্ষা বলয় তৈরিতে এ সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ
চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করে। এ অর্থায়নের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিন বছর মেয়াদি কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ সহায়তার ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ধারিত হবে।
তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন এখনও অনুমোদিত ঋণ নয়; এটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা অনুরোধ। অর্থের পরিমাণ, ঋণের শর্ত ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি নির্ধারণে আরও আলোচনা প্রয়োজন। ঋণ পাওয়া গেলে অর্থনীতির ওপর চাপ সামলানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ঋণের ব্যয় ও পরিশোধের শর্ত বিবেচনায় নিয়েই এর প্রকৃত সুফল নির্ধারিত হবে।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে : আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক অর্থায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে শর্ত পূরণ ও সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে অর্থায়ন পেতে বিলম্ব হতে পারে।
ব্যাংক পুনর্গঠনে আইএফসির আগ্রহ : বাংলাদেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণে সহায়তার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক সাড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হলে ব্যাংক পুনর্গঠনে সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোন ব্যাংকে কত অর্থ বিনিয়োগ হবে, কী শর্তে হবে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা : ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির আরেকটি লক্ষ্য ছিল থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা। আলোচনায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য, শিল্প উৎপাদন এবং যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা উঠে এসেছে।
থাইল্যান্ডের প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি, কৃষিপণ্য ও স্থানীয় বাজারকে যুক্ত করা গেলে দেশে মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের রানং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব উদ্যোগ এখনও সম্ভাবনা অনুসন্ধান ও সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পর্যায়ে রয়েছে। নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ বা বাস্তবায়ন সময়সূচি ঘোষণা না হওয়ায় এগুলোকে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ : বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বৈশ্বিক উদ্যোগেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১১২ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি পুঁজি সংযুক্ত করতে সহায়তা করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। ২০২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
সভায় বাংলাদেশ নিজেদের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। আর্থিক শৃঙ্খলা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলেই অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সংস্কারের প্রভাব বিবেচনায় রাখতে হবে। আর সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
