শারদীয়া দুর্গাপূজার মহাসপ্তামীতে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন এবং রমনা কালী মন্দির মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে বলা হয়, রোববার দুপুরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ দুটি পূজামণ্ডপে যান এবং পুণ্যার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। এ সময় রাষ্ট্রপতি তাদের দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা জানান।
হাটখোলার রামকৃষ্ণ মিশন পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে এক মতবিনিময়ে সভায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে বক্তব্যে তিনি সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা চাই এই দেশের সংবিধান প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষকে যে অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকার রক্ষা হোক। এ দেশের নাগরিকগণ যে ধর্মেরই হোক না কেন, তারা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবে কাজ করবেন। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।”
সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি ধর্মের মানুষের মধ্যে যে বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা একদিনে কিংবা দুইদিনে সৃষ্টি হয়নি। হাজার বছরের ঐতিহ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এই বন্ধন সুদৃঢ় হয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাসে গড়ে ওঠা এই আত্মার বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য আমরা যে কোনো মূল্যে অটুট রাখব।
“আমরা সেই বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে সবাই শান্তিতে থাকব, সুখে থাকব। যে বাংলাদেশে আমাদের ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ থাকবে না। সকলে তাদের ধর্ম নিশ্চিন্তে পালন করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদেরই কিছু মানুষ বিভিন্ন সময়ে কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে, কখনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে, আবার কখনো অসৎ অভিপ্রায়ে দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল ধরিয়ে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে। এ ধরনের বিভেদ ও বিভাজন কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং তা আমাদের ঐতিহ্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিপন্থি।”
দুর্গাপূজা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ছাত্রজীবনে আমি দুর্গাপূজা মণ্ডপে গিয়েছি, নাটক করেছি, আবৃত্তি করেছি।”
সবাইকে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “দুর্গাপূজার উদযাপন নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করছে।”
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সভার সভাপতি ও রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালনা পর্ষদের সহ সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা বক্তব্য দেন।
এর আগে রমনা কালী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে মত বিনিময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যখন সংঘাত, হানাহানি ও হিংসা-বিদ্বেষ বিরাজ করছে, তখন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে পারছেন। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
এই দেশে বারবার অসুরের আবির্ভাব হয়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে পরাজিত করেছে মন্তব্য করে তিনি রমনা কালী মন্দিরের ইতিহাস তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, “১৯৭১ সালে এটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে এটাকে ধ্বংস করা হয়। যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, তাদের হাতেই এই অপকর্ম হয়েছিল।
“২০০১ সালে বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে এই রমনা কালীমন্দির পুনঃস্থাপিত হয় এবং তখন থেকেই এটাকে আবার পুরনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।”
বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে রাষ্ট্রপতি আশ্বস্ত করেন।
মত বিনিময়ে আরও ছিলেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, রমনা মন্দিরের সভাপতি অর্পনা রায় দাস ও সাধারণ সম্পাদক মিল্টন বৈদ্য। অনুষ্ঠানে রমনা মন্দিরের সদস্য সুভাষ চন্দ্র দাস রাষ্ট্রপতিকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন।
